চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার এক কৃষকের ব্যতিক্রমী বিদেশি জাতের আমের বাগান এখন স্থানীয়দের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। থাই, ব্রুনেই, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিভিন্ন জাতের আম চাষ করে চলতি মৌসুমেই তিনি বিক্রি করেছেন প্রায় ১০ হাজার কেজি আম। এতে আয় হয়েছে ৮ লাখ টাকার বেশি।
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার খিতাপচর গ্রামের কৃষক মিনারুল হকের বাগানে মৌসুম শেষ হলেও এখনো আলোচনায় রয়েছে তাঁর চাষ করা বিদেশি জাতের আম। কয়েক সপ্তাহ আগেও থাই চিয়াংমাই, ব্রুনেই কিং, রেড পালমার, হানিডিউ, কাটিমনসহ বিভিন্ন জাতের আম কিনতে প্রতিদিন ভিড় করতেন ক্রেতারা। বর্তমানে অধিকাংশ গাছ ফলশূন্য, কেবল কয়েকটি বারি-৪ আমগাছে শেষ দফার ফল ঝুলছে।
চলতি মৌসুমে আম্রপালি ও বারি-৪-এর পাশাপাশি বাগানে ছিল থাইল্যান্ডের কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, কিউজাই, চিয়াংমাই, হানিডিউ, কিং অব চাকাপাত, ব্ল্যাক স্টোন, ব্রুনেইয়ের ব্রুনেই কিং, যুক্তরাষ্ট্রের রেড পালমার এবং চীনের রেড আইভরিসহ মোট ১৩ জাতের আম। ব্যতিক্রমী আকৃতি, রং ও স্বাদের কারণে এসব আম দেখতে, কিনতে ও স্বাদ নিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ বাগানে ছুটে আসেন।
মিনারুল হক জানান, বিদেশি জাতের আম দেশের আবহাওয়ায় ফলন দেবে কি না—এ নিয়ে শুরুতে শঙ্কা ছিল। তবে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফলন হয়েছে এবং ক্রেতারও কোনো অভাব হয়নি। তিনি বলেন, “ভয়ে ভয়ে এসব বিদেশি জাতের আমের চারা লাগিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, আমাদের আবহাওয়ায় ফলন হবে কি না। কিন্তু ফলন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি ক্রেতারও অভাব হয়নি। আগামী মৌসুমে আরও বড় পরিসরে আমের চাষ করব।”
ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের আমে ক্রেতাদের আগ্রহ
কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রতিটি জাতের আমের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। আম্রপালি ও বারি-৪ উচ্চ ফলনশীল এবং বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয়। কাটিমন বছরে একাধিকবার ফল দেয়, ব্যানানা ম্যাঙ্গো কলার মতো লম্বাটে এবং রেড পালমার পাকলেও খোসায় লালচে আভা বজায় রাখে। অন্যদিকে চিয়াংমাই, কিউজাই, ব্রুনেই কিং, হানিডিউ, ব্ল্যাক স্টোন ও কিং অব চাকাপাত আকার, স্বাদ, সুগন্ধ ও পাকার সময়ের দিক থেকে একে অপরের থেকে আলাদা। এসব বৈচিত্র্যের কারণে মে মাস থেকে মৌসুমের শেষ পর্যন্ত ধাপে ধাপে ফল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মসিউর রহমান বলেন, বারোমাসি কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, কিউজাই, চিয়াংমাই, হানিডিউ ও ব্ল্যাক স্টোনসহ বিভিন্ন বিদেশি জাতের আম নিয়ে গবেষণা চলছে। তাঁর মতে, কয়েকটি জাত বাংলাদেশের আবহাওয়ায় আশাব্যঞ্জক ফলন দিচ্ছে। তবে বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিক চাষের আগে ফলন, রোগবালাই সহনশীলতা এবং স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজন নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
৩৫ হাজার টাকার উদ্যোগ থেকে ১০ একরের সমন্বিত খামার
ছয় বছর আগে মিনারুল হকের অধিকাংশ জমি ছিল অনাবাদি। জোয়ারের লোনা পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত সেই জমিতে চাষাবাদের সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। এ সময় চাকরি না পেয়ে তাঁর দুই ছেলে তানভীরুল হক ও সাইদুল হক বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মাত্র ৩৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে ৭০টি বরইগাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে সেই উদ্যোগ ১০ একরজুড়ে বিস্তৃত ‘মেসার্স হক অ্যাগ্রো ফার্ম’-এ রূপ নিয়েছে।
খামারে এখন প্রায় সাড়ে চার হাজার ফলগাছ রয়েছে। আম ছাড়াও বরই, পেয়ারা, মাল্টা, কলা, ডাব ও সুপারির বাগান রয়েছে। পাশাপাশি মাছের ঘের, গরু, ছাগল ও হাঁসের খামারও পরিচালিত হচ্ছে। খামারের বর্জ্য থেকে উৎপাদিত জৈব সার আবার ফলগাছে ব্যবহার করা হয়, ফলে পুরো ব্যবস্থাটি সমন্বিত কৃষি মডেল হিসেবে গড়ে উঠেছে।
বাজারে নয়, ক্রেতাই আসেন বাগানে
তানভীরুল হক জানান, একই ধরনের ফলের পরিবর্তে ব্যতিক্রমী জাতের আম চাষের সিদ্ধান্তই তাঁদের সাফল্যের মূল কারণ। বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা এসব চারার কারণে এখন নির্দিষ্ট জাতের আমের খোঁজে অনেকেই সরাসরি বাগানে আসেন।
তিনি বলেন, ফল বিক্রির জন্য বাজারে যেতে হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা পরিচিতদের মাধ্যমে খবর পেয়ে পরিবার নিয়ে মানুষ বাগানে আসেন। কেউ গাছ থেকে নিজের পছন্দের আম সংগ্রহ করেন, আবার কেউ আগেই বুকিং দিয়ে রাখেন। এ বছর মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই প্রায় সব আম বিক্রি হয়ে গেছে।
বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকার আয়
শুধু আম নয়, চলতি বছরে পেয়ারা বিক্রি করে প্রায় ২ লাখ টাকা, বরই থেকে ৫ লাখ টাকা, সুপারি থেকে ৪ লাখ টাকা, ডাব থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং কলা বিক্রি করে প্রায় ১ লাখ টাকা আয় হয়েছে। সব মিলিয়ে গত এক বছরে খামার থেকে মোট আয় হয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকা।
এই খামারে নিয়মিত চারজন শ্রমিক কাজ করেন। মৌসুমে কাজের চাপ বাড়লে অতিরিক্ত শ্রমিকও নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে এটি স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে।
কৃষি বিভাগের মূল্যায়ন
বোয়ালখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহানুর ইসলাম বলেন, মিনারুল হকের পরিবারের মাসিক আয় বর্তমানে এক লাখ টাকার বেশি। তাঁর মতে, এই পরিবারের সফলতা দেখে এলাকার অনেক কৃষক ফলের বাগান ও সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলতে উৎসাহিত হচ্ছেন।
মিনারুল হক বলেন, একসময় অনেকেই মনে করতেন তাঁর জমিতে চাষাবাদ সম্ভব নয়। এখন সেই মানুষরাই বাগান দেখতে আসেন, চারা সংগ্রহ করেন এবং কৃষিকাজের পরামর্শ নেন। তাঁর ভাষায়, “একসময় মানুষ বলত, এই জমিতে কিছুই হবে না। এখন সেই মানুষই বাগান দেখতে আসে, চারা নিয়ে যায়, পরামর্শ চায়। এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।”

