রাজশাহীতে ফল গবেষণার ধারাবাহিক সাফল্য বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা ও উন্নত জাত উদ্ভাবনের ফলে ঐতিহ্যগত শস্যভিত্তিক কৃষি থেকে ফলচাষের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকরা। তবে পর্যাপ্ত জনবল সংকটের কারণে গবেষণা কার্যক্রমের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রাজশাহী মহানগরীর বিনোদপুরে অবস্থিত আঞ্চলিক ফল গবেষণা কেন্দ্র এ পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। কেন্দ্রটি উন্নত জাতের ফল উদ্ভাবন, টিস্যু কালচার প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ফলচাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে আম, স্ট্রবেরি ও ড্রাগন ফলসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
গবেষণার প্রভাবে স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তারা ড্রাগন ফল, মাল্টা ও বিভিন্ন উন্নত জাতের পেয়ারাসহ বিদেশি ফলের বাণিজ্যিক চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। ইতোমধ্যে অনেক উদ্যোক্তা উল্লেখযোগ্য আর্থিক সাফল্যও অর্জন করেছেন। এ ক্ষেত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
একসময় বরেন্দ্র অঞ্চল প্রধানত ধান ও অন্যান্য শস্য উৎপাদনের জন্য পরিচিত ছিল। বর্তমানে আমসহ নানা ধরনের ফলের আবাদ বৃদ্ধির ফলে অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে আম, লিচু ও কুল নিয়ে গবেষণা করলেও বর্তমানে কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়েছে। ফলের নতুন জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি, রোগবালাই ও কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনা এবং ফলন বৃদ্ধির কৌশল নিয়েও গবেষণা চলছে।
লিচু চাষে সঠিক ছাঁটাইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা বলেন, অনেক কৃষক এ বিষয়ে সচেতন নন। ফল সংগ্রহের পর নিয়মিত ছাঁটাই করলে লিচুর ফলন ও গুণগত মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
আম গবেষণার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত বারি আম-১ থেকে বারি আম-১৮ পর্যন্ত বিভিন্ন জাতের সংরক্ষণ ও গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে বারি আম-৩ (আম্রপালি), বারি আম-৪ (শংকর) এবং বারি আম-১৪ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সম্ভাবনাময় জাত যেমন সূর্যপুরি, কিং চাকাপট, চিয়াং মাই, কিউ-জাই, মিয়াজাকি, দুধশর ও মল্লিকা নিয়ে সমৃদ্ধ জার্মপ্লাজম সংগ্রহশালা গড়ে তোলা হয়েছে। ক্ষীরসাপাত, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, কলা আম, কাটিমন ও হাড়িভঙ্গাসহ জনপ্রিয় জাতগুলোর ওপরও গবেষণা চলছে।
সম্প্রতি কেন্দ্রটি বিভিন্ন জাতের আঙুর সংগ্রহ করে পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেছে। ফলাফল সন্তোষজনক হলে এসব জাত কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
বর্তমানে আম ও লিচুর পাশাপাশি মোম আপেল, পেয়ারা, জাম্বুরা, আঙুর, কুল, নারকেল, কাঁঠাল, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, ডালিম, ফালসা, আমড়া, জলপাই, মাল্টা, জাম, কলা ও পেঁপে নিয়েও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
গবেষণা কেন্দ্রটি কৃষকদের রোগবালাই শনাক্তকরণ, জাত নির্বাচন, উৎপাদন প্রযুক্তি এবং কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে কৃষকরা কম খরচে বেশি ফলন পেয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
তবে জনবল সংকট কেন্দ্রটির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক গবেষক ও কারিগরি কর্মী না থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকল্পের সম্প্রসারণ ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা গেলে বরেন্দ্র অঞ্চলে ফল উৎপাদন ও কৃষি উন্নয়নে কেন্দ্রটি আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
