আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা কমে আসার প্রেক্ষাপটে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সকে দেশের উন্নয়ন ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় আরও পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের সংসদ সদস্য রূপা হক।
শনিবার (৩ অক্টোবর) ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বাংলাদেশি প্রবাসীদের অর্থনৈতিক অবদান, রাজনৈতিক ভূমিকা এবং তাদের পরিচয় ও সামাজিক পরিবর্তনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
রূপা হকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হিসাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৮৭ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন। তবে বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে। সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন সৌদি আরবে—প্রায় ৩৫ লাখ। ইউরোপে যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বড় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী রয়েছে। পাশাপাশি প্যারিস ও মাদ্রিদের মতো শহরেও বাংলাদেশি কমিউনিটির উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রূপা হক বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কাতারসহ উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করা অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু যুক্তরাজ্য থেকেই বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন পাউন্ড রেমিট্যান্স বাংলাদেশে পাঠানো হয়।
রূপা হক বলেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক সাহায্য কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুক্তরাজ্যে একসময় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ আন্তর্জাতিক সাহায্যে দেওয়ার নীতি থাকলেও তা কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বা তারও নিচে নামানো হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য কর্মসূচি, রোগ প্রতিরোধ এবং নারী শিক্ষার মতো বিভিন্ন বৈশ্বিক উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ অবস্থায় দানশীল ব্যক্তি ও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক সাহায্যের ঘাটতি মোকাবিলায় নতুন অর্থায়ন মডেল তৈরির আহ্বান জানান তিনি।
প্রবাসীদের রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়টিও বক্তব্যে তুলে ধরেন রূপা হক। তিনি জানান, সম্প্রতি ভোটাধিকার পাওয়ার পর প্রায় পাঁচ লাখ অনিবাসী বাংলাদেশি (এনআরবি) ভোট দিয়েছেন। অভিবাসীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকার কারণে যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ ব্যবস্থার প্রশংসাও করেন তিনি।
২০২৪ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রবাসীদের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন রূপা হক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ার, বিগ বেন ও ম্যানচেস্টারসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশের মাধ্যমে প্রবাসীরা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সামাজিক ও পরিচয়গত পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরেন রূপা হক। তিনি বলেন, গত কয়েক দশকে প্রবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। সত্তরের দশকের বিভিন্ন বাধা পেরিয়ে বর্তমান প্রজন্ম নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখেই ব্রিটিশ সমাজের মূলধারার সঙ্গে সমন্বিত হতে পেরেছে।
নিজের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে বক্তব্যের শেষ দিকে রূপা হক বলেন, ‘একটি মেয়েকে বাংলাদেশ থেকে বের করে আনা সম্ভব, কিন্তু সেই মেয়েটির ভেতর থেকে বাংলাদেশকে কখনো বের করে আনা সম্ভব নয়।’
