আর্থিক সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংককে বিশেষ অনুমতিতে নির্মাণাধীন ‘টুইন টাওয়ার’-এর একটি ভবন বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক কোম্পানি আইনে এ ধরনের কার্যক্রমের অনুমতি না থাকলেও সরকারের সম্মতি নিয়ে বিশেষ ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, ভবন ভাড়া থেকে অর্জিত আয় ব্যাংকটির চলমান আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
রাজধানীর পান্থপথে সার্ক ফোয়ারার পশ্চিম পাশে ৬৪ কাঠা জমির ওপর নির্মিত দুটি ১২ তলা ভবন নিয়ে গড়ে উঠছে ন্যাশনাল ব্যাংকের ‘টুইন টাওয়ার’ প্রকল্প। মোট প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজার বর্গফুট ফ্লোর স্পেসের এ প্রকল্পের একটি ভবনে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর করা হবে, আর অন্যটি ভাড়া দেওয়া হবে। ভবন দুটির নির্মাণ ব্যয় ইতোমধ্যে ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোনো ব্যাংক ভবন ভাড়া দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে না। তবে ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে আইনগত বিধান থেকে বিশেষ অব্যাহতি দিয়ে এই অনুমোদন দিয়েছে। দেশে এ ধরনের অনুমতি আগে কোনো ব্যাংককে দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতেও মাঝেমধ্যে অন্য উৎস থেকে অর্থ ধার করতে হচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংককে। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরির উদ্দেশ্যেই ভবন ভাড়া দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকটির পক্ষ থেকে একটি ভবনে প্রধান কার্যালয় এবং অন্যটিতে আবাসিক হোটেল গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হোটেল নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন না দিয়ে শুধুমাত্র বাণিজ্যিকভাবে ভবন ভাড়া দেওয়ার অনুমতি দেয়।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
টুইন টাওয়ার নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৪ সালে। ২০১৫ সালে পাইলিংয়ের সময় দুর্ঘটনায় পাশের একটি হোটেলের সীমানাপ্রাচীর, নিরাপত্তাকর্মীদের কক্ষ এবং অভ্যন্তরীণ সড়কের অংশ ধসে পড়ায় কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিল। পরে একাধিক দফায় প্রকল্প ব্যয় সংশোধনের মাধ্যমে নির্মাণকাজ আবার শুরু হয়।
বর্তমানে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় সিকদার গ্রুপের মালিকানাধীন একটি ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। এর জন্য প্রতি মাসে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন পরিচালনা পর্ষদ নিজস্ব ভবনে প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়।
টুইন টাওয়ারের একটি ভবন নিজস্ব ব্যবহারের পরিবর্তে ভাড়া দিলে ব্যাংকের আয় বাড়বে—এ যুক্তি তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করে ন্যাশনাল ব্যাংক। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৯ জুন সরকারকে সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে। সরকারের সম্মতির পর প্রজ্ঞাপন জারি করে ব্যাংকটিকে এ বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি, যার পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি রয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে ব্যাংকটির লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা এবং এখনো ব্যাংকটি লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভবন ভাড়া থেকে সম্ভাব্য আয় ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা কিছুটা বাড়াতে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
