কঠোর আইন ও শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ইয়াবার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আসক্তির কারণে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে গভীর সংকট তৈরি হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য আইরিশ টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল আইন প্রয়োগ নয়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
প্রতিবেদনে ঢাকার এক ইয়াবাসক্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আসক্তির ভয়াবহ দিক তুলে ধরা হয়েছে। পরিচয় গোপন রাখতে ছদ্মনাম ব্যবহার করা ওই ব্যক্তি জানান, মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি ইয়াবা তার স্বাভাবিক জীবন প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। তার ভাষায়, “এই জিনিসটা আমার মনমানসিকতা একেবারে শেষ করে দিয়েছে।”
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, থাই ভাষায় ‘ইয়াবা’ শব্দের অর্থ ‘পাগল করা ওষুধ’। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে লাখো মানুষ এই মাদকে আসক্ত এবং এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ইয়াবা সেবনের পর দীর্ঘ সময় জেগে থাকা, পরে টানা অনেক ঘণ্টা ঘুমিয়ে থাকা, শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার মতো নানা জটিলতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, দেশের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত। নতুন সিন্থেটিক ও আধা-সিন্থেটিক মাদকের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এদিকে চলতি মাসে মাদকসংক্রান্ত কয়েকটি অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিলও সংসদে অনুমোদন পেয়েছে।
প্রতিবেদনে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, ২০১৮ সালে ইয়াবাসহ মাদকের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে কয়েক মাসের মধ্যে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আরিফুজ্জামান বলেন, মাদক ব্যবহার কমাতে হলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। তার ভাষায়, দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩৫০ জন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। তিনি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আরিফুজ্জামানের মতে, ইয়াবা আসক্তি এখন খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। অনেক ব্যবহারকারী একই সঙ্গে অন্যান্য মাদকও গ্রহণ করেন। সহজলভ্যতা, মানসিক বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সাইকোসিসসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যাও মানুষকে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে মাদকের খরচ জোগাতে আসক্তরাই পরে মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসের সীমান্তবর্তী ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ অঞ্চল এখনো বিশ্বের অন্যতম বড় সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনকেন্দ্র। ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশে আসা ইয়াবার বড় অংশ মিয়ানমার থেকে আসে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইয়াবাসক্ত ওই ব্যক্তি জানান, বাংলাদেশে অনেকের মাদকাসক্তির শুরু হয় সিগারেট দিয়ে, এরপর গাঁজা এবং পরে ইয়াবায় পৌঁছায়। প্রথমবার ইয়াবা গ্রহণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, “এই জিনিসটা মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়।” তার দাবি, বর্তমানে ইয়াবা সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় অন্যান্য অনেক মাদককে কার্যত প্রতিস্থাপন করেছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যেই এই মাদক বিক্রির দৃশ্য দেখা যায় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক চাপও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে। ওই আসক্ত ব্যক্তি মনে করেন, অর্থনৈতিক সংকট, অপরাধ ও মাদকাসক্তির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। তার ভাষায়, “এটি ধীরে ধীরে বিষপ্রয়োগ, এটি একটি নিখুঁত পরিকল্পনা।”
