২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের ছিল বলে জানিয়েছে এ ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি। তবে বিশ্বকাপ বয়কটের দায় কার—এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। কমিটির প্রধান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এ কে এম ওয়ালী উল্লাহ। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও বিসিবির বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর।
এ বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অংশ নেয়নি। পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশকে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সেই দাবিতে সাড়া না দেওয়ায় বাংলাদেশ বিশ্বকাপে যায়নি।
বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত যে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল, তা এর আগে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল এবং ওই সময় বিসিবি সভাপতির দায়িত্বে থাকা আমিনুল ইসলামও জানিয়েছিলেন।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের না যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। আজ কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
তদন্তের মূল ভিত্তি ছিল যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে বিসিবির কাছে পাঠানো একটি চিঠি। ওই চিঠিতে নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না বলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
তদন্ত কমিটি বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে। তাঁদের মধ্যে ক্রীড়া সাংবাদিক, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সিনিয়র সহকারী কোচ সালাহউদ্দিন, বাংলাদেশ টেস্ট দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন, টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাস এবং বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল রয়েছেন।
তবে তদন্ত কমিটি অধ্যাপক আসিফ নজরুল, বিসিবির সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম ও আইসিসির সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেনি। প্রতিবেদনে আসিফ নজরুলের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য ব্যবহার করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এত বড় একটি সিদ্ধান্ত একজন ব্যক্তির নেওয়া উচিত নয়। তবে প্রতিবেদনের লিখিত অংশে ওই ‘একজন ব্যক্তি’ কে, তা উল্লেখ করা হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর বলেন, তাঁরা ‘এই একজন’ বলতে তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে বুঝিয়েছেন। তিনি আরও জানান, আমিনুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।
কমিটির প্রধান ওয়ালী উল্লাহ বলেন, ‘এটা সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল।’ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কেন খেলতে পারেনি—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশ খেলতে যেতে পারেনি।
তবে তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, কারও দোষ নির্ধারণ করা তাদের তদন্তের উদ্দেশ্য ছিল না। কমিটির সদস্য ওয়ালী উল্লাহ বলেন, যেহেতু সরকার সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, তাই সরকারকে দোষারোপ করার প্রশ্ন আসে না।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিশ্বকাপে যাওয়া উচিত ছিল বলে কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর মনে করেন। তবে বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক না ভুল—এ বিষয়ে ওয়ালী উল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট মন্তব্য করেননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তখনকার পরিস্থিতিতে সরকার সিদ্ধান্ত দিয়েছিল এবং মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পর বিসিবি সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপে না যাওয়ার ঘটনাটি বিসিবির ভেতরের কিছু গভীর ও কাঠামোগত দুর্বলতা এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতার বিষয় সামনে এনেছে।
এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি সাতটি সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন থেকে মুক্ত রাখা, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের স্বার্থ রক্ষায় বিসিবির আনুষ্ঠানিক নীতিমালা তৈরি এবং বিসিবির স্বায়ত্তশাসন শক্তিশালী করার বিষয় রয়েছে।
এ ছাড়া ভবিষ্যতে বিসিবির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং যোগাযোগের মাধ্যমগুলো আরও স্পষ্ট করার সুপারিশও করা হয়েছে।
