ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করে নির্যাতনের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে চক্রটির বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৩৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। এ ঘটনায় ৩৪ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে এবং তাঁদের সম্পদের উৎস অনুসন্ধান চলছে।
সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রটির সদস্যরা ইতালিতে চাকরি ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে লোকজনকে লিবিয়ায় পাঠাতেন। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁদের জিম্মি করে নির্যাতন চালানো হতো। সেই নির্যাতনের ভিডিও দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ দিয়েই চক্রের সদস্যরা বাড়ি, গাড়ি, গরুর খামারসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
তদন্তে চক্রটির অন্যতম সদস্য হিসেবে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার সাতবাড়িয়া গ্রামের আলাউদ্দিন শেখ এবং আওয়াল ফরাজীর নাম উঠে এসেছে। গত ১৩ এপ্রিল সিআইডি তাঁদেরসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। তদন্তে জানা গেছে, দেশের ১১টি জেলায় বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মানব পাচার, মুক্তিপণ আদায় এবং হুন্ডি কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অর্ধশতাধিক চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের অনেক সদস্যই অবৈধভাবে অর্জিত অর্থে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মুহাম্মদ বাছির উদ্দিন বলেন, চক্রটির বিরুদ্ধে মানব পাচার, মুক্তিপণ আদায় ও হুন্ডি কারবারের অভিযোগে মামলা হয়েছে এবং তাদের সম্পদের উৎস অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
সরেজমিনে আলাউদ্দিন শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঁচু সীমানাপ্রাচীরঘেরা বাড়িতে রয়েছে সিসিটিভি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পরিবারের সদস্যরা জানান, বাড়ির পাশে গরুর খামার রয়েছে এবং আরও একটি খামার নির্মাণাধীন। খুলনায় তাঁদের একটি বিলাসবহুল বাড়ি ও দামি গাড়িও রয়েছে।
আলাউদ্দিনের বাবা আলী শেখ দাবি করেন, আগে কৃষিকাজ করে সংসার চললেও ছেলে বিদেশে যাওয়ার পর আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন আসে। তাঁর ভাষ্য, “ছেলে বিদেশ যাওয়ার পর থেকেই আমাগে পরিবর্তন হয়েছে।” তিনি আরও দাবি করেন, আলাউদ্দিন লিবিয়ায় ঠিকাদারি করতেন এবং বৈধভাবেই অর্থ দেশে পাঠাতেন।
অন্যদিকে আলাউদ্দিন শেখও দাবি করেন, তিনি লিবিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরি করতেন এবং সেই আয়ের অর্থেই বাড়ি ও খামার নির্মাণ করেছেন।
আওয়াল ফরাজীর পরিবারের পক্ষ থেকেও অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাঁর মা হারিচা বেগম বলেন, “আগে কয়দিন বিদেশে লোক নেছেলো। এক বছরের মতো আওয়াল বাড়ি আসার পর সব ত্যাগ কইরে দেছে।” তবে মামলার পর থেকে আওয়াল ফরাজী আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
সিআইডির তদন্তে জানা গেছে, মুক্তিপণের অর্থ অন্তত ১১৪টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন করা হয়েছে। এসব হিসাবে চক্রের সদস্যদের পাশাপাশি তাঁদের স্বজন, পরিচিত ব্যক্তি, গৃহিণী, মুদিদোকানি এবং ওষুধ ব্যবসায়ীদের হিসাবও ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতি লাখ টাকায় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা কমিশনের বিনিময়ে এসব হিসাব ব্যবহার করা হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, একই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মানব পাচার, মুক্তিপণ আদায় এবং হুন্ডি কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন রাখতে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া মুক্তিপণ ও হুন্ডির অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ১৮টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শনাক্ত করেছে সিআইডি। মামলায় এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও আসামি করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই নামসর্বস্ব এবং হুন্ডি লেনদেনের জন্য ব্যবহার করা হতো।
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বাসিন্দা আমেনা বেগম জানান, ছেলে-মেয়ের পরিবারের পাঁচ সদস্যকে ইতালি পাঠানোর জন্য দালালদের সঙ্গে ৯০ লাখ টাকার চুক্তি করেছিলেন। জমি বিক্রি ও ঋণ করে সেই অর্থ পরিশোধের পরও তাঁদের ইতালির বদলে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে আরও অর্থ দাবি করা হয়।
আমেনা বেগমের ভাষ্য, মানব পাচার চক্রের সদস্য মিনা বেগম, নুরুল ইসলাম ও মুরাদ মিয়ার ব্যাংক হিসাবে তিনি ৭৫ লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। এরপর তাঁদের স্বজনদের নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পাঠানো হয়।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, আলাউদ্দিন শেখের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্ক দেশের ১১টি জেলার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয়। স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মানুষ সংগ্রহ করা হতো। পরে তাঁদের লিবিয়ায় আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হতো।
ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, লিবিয়া থেকে ফিরে আসা ৫৫৭ জন বাংলাদেশির মধ্যে ৬০ শতাংশের পরিবারকে ভালো চাকরির আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছে ৮৯ শতাংশ কোনো কাজ পাননি। ৬৩ শতাংশ যাত্রাপথেই বন্দী হন এবং বন্দীদের ৯৩ শতাংশকে বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। এদের ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। এছাড়া ৬৮ শতাংশ চলাচলের স্বাধীনতা হারান, ৫৪ শতাংশ দিনে তিন বেলা খাবার পাননি এবং ২২ শতাংশ দিনে মাত্র এক বেলা খাবার পেয়েছেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, “লিবিয়ায় শতাধিক ক্যাম্প রয়েছে, যেখানে জিম্মি করে মানুষকে নির্যাতন করা হয়। লিবিয়ায় জিম্মি করে পরিবারের কাছে ৫ থেকে ৭৬ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ নেওয়া হয়েছে।” তিনি এ ধরনের চক্রের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানান।
