আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা একদল তরুণ নারী। নারী নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বিদ্যমান বাধা ও বৈষম্য মোকাবিলা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করার কথা জানিয়েছেন তারা।
মানিকগঞ্জের কৈট্টায় প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী তরুণ নারী সম্মেলনে এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা। নরওয়ে দূতাবাস ও ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় নারীপক্ষ এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
১৭ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া সম্মেলনে ঢাকা, রাজশাহী ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে তরুণ নারীরা অংশ নেন। জাতীয় সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করা হয়। ইউএন উইমেনের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলী সিং সম্মেলনের উদ্বোধন করেন।
গীতাঞ্জলী সিং বলেন, বাংলাদেশে শক্তিশালী নারী আন্দোলন থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি এখনো কম। এ ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। তরুণ নারী নেতৃত্বকে এগিয়ে নিতে আন্তঃদলীয় ও আন্তঃপ্রজন্মের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
নারীপক্ষের সভাপতি কে এ জাহান রুমী বলেন, বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যৎ গড়তে তরুণ নারীদের কণ্ঠ, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নারীপক্ষের সদস্য মাহীন সুলতানা বলেন, জনজীবনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তাদের প্রতিনিধিত্ব এখনো কম। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের আন্দোলনে তরুণ নারীদের অংশগ্রহণ থাকলেও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের ধরে রাখা যায়নি।
সম্মেলনের মূল অধিবেশনে ‘জনজীবনে নারী নেতৃত্ব অংশগ্রহণ থেকে প্রভাব বিস্তার’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংসদ সদস্য ড. নীলুফা চৌধুরী মনি, সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম, সাংস্কৃতিক কর্মী বিথী ঘোষ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার এবং নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের প্রভাষক তাপসী দে অংশ নেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে নারীর উপস্থিতি থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠায় বৈষম্যমূলক কাঠামোর পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
নীলুফা চৌধুরী মনি বলেন, রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকার পরও নারীদের নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। ২০২৬ সালেও নারীদের যোগ্যতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা প্রমাণ করতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, নারী সংস্কার কমিশন নির্বাচনে প্রতিটি দল থেকে ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নের সুপারিশ করেছিল, তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। তার বক্তব্যে রাজনৈতিক
জলি তালুকদার বলেন, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সংসদসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো রয়েছে। বিভিন্ন শিল্প ও কারখানায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হলেও ট্রেড ইউনিয়নে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সাংস্কৃতিক কর্মী বিথী ঘোষ বলেন, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নারীর উপস্থিতি থাকলেও নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পুরুষের প্রাধান্য দেখা যায়। তাপসী দে-ও পরিবার, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর কম উপস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরেন।
সম্মেলনের আন্তঃবিভাগীয় অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্বে তরুণ নারী নেত্রীরা জনজীবনে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পরে প্রতিফলন পর্বে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, মানবাধিকার ও ইউএন উইমেনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
দুই দিনব্যাপী সম্মেলনে তরুণ নারী নেতৃত্ব বিকাশে রাজনীতি, তরুণ নারীদের কণ্ঠস্বর তৈরি, দলীয় কাজ, সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি ও কর্মপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর সমাপনী পর্বের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শেষ হয়।
নারীপক্ষ ১৯৮৩ সালে নারীর প্রতি বৈষম্য, অবিচার ও সহিংসতার বিরুদ্ধে এবং নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটি ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগে জনজীবনে নারীর নেতৃত্ব বিকাশ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
