প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা এবং অর্থনীতির কাঠামো দ্রুত পরিবর্তন করছে। প্রযুক্তির এই রূপান্তরমূলক সময়ে এআই-সংক্রান্ত জ্ঞান ও দক্ষতা ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা সাফল্যের অন্যতম প্রধান শর্ত হয়ে উঠছে। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, এআই ব্যবহারে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম, যা ভবিষ্যতে ডিজিটাল বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে নারীরা প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির নতুন সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়তে পারেন। ফলে কর্মসংস্থান, আয় এবং উদ্যোক্তা সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা গড়ে পুরুষদের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম হারে এআইভিত্তিক টুল ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক এআই পেশাজীবীদের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ এখনো ২২ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির ব্যবহার ও উন্নয়নে নারীদের কম উপস্থিতি ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে তাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। তাই এই ব্যবধান কমাতে এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, জেনারেটিভ এআই বিভিন্ন খাতে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে সক্ষম। অনেক ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতা ১৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা গেছে।
বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) গবেষণা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চাকরি কোনো না কোনোভাবে জেনারেটিভ এআই দ্বারা প্রভাবিত হবে। এর ফলে নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা বাড়বে এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন কর্মীদের জন্য উচ্চ আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তা খাতেও এআই দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে এআই দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রযুক্তিই পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। এটি নির্মাতা ও প্রশিক্ষণ ডেটার প্রভাব বহন করে। ফলে প্রযুক্তি উন্নয়নে নারীদের অংশগ্রহণ কম হলে এআই সিস্টেমে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে নিয়োগ, ঋণ অনুমোদন, স্বাস্থ্যসেবা, বিপণন এবং কনটেন্ট তৈরির মতো বহু ক্ষেত্রে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি উন্নয়নে বৈচিত্র্যময় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসমতা বা পক্ষপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীরা গবেষক, ডেটা বিশ্লেষক, সফটওয়্যার ডেভেলপার এবং নীতিনির্ধারক হিসেবে যত বেশি যুক্ত হবেন, এআই প্রযুক্তি তত বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল হবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এআই ইতোমধ্যে ব্যবসা পরিচালনার ধরন বদলে দিচ্ছে। গ্রাহকের আচরণ বিশ্লেষণ, বিক্রয় পূর্বাভাস, স্বয়ংক্রিয় গ্রাহকসেবা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিপণনে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, জেনারেটিভ এআই কার্যকরভাবে ব্যবহার করলে বিপণন কার্যক্রমে আয় বাড়ানো এবং পরিচালন ব্যয় কমানো সম্ভব। ফলে নারী উদ্যোক্তারা কম সম্পদ ব্যবহার করে বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন।
বিশেষ করে ই-কমার্স ব্যবসায় এআই গ্রাহকের পছন্দ বিশ্লেষণ, পণ্যের সুপারিশ এবং সার্বক্ষণিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে ব্যবসার দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারীদের এআই দক্ষতায় এগিয়ে নিতে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ডিজিটাল সাক্ষরতা, কোডিং, ডেটা বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি খাতে নারী মেন্টর তৈরি এবং সফল নারী রোল মডেল তুলে ধরার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক (STEM) শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো ছাড়া প্রযুক্তিখাতে টেকসই প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় নারীদের এআই দক্ষতা বৃদ্ধি শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সমান সুযোগ এবং ডিজিটাল ভবিষ্যতে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। তাই নারী-পুরুষের মধ্যে প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমাতে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
