নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি; পর্যটক নিরাপত্তায় হাউসবোট পরিচালনায় বিশেষ নির্দেশনা জেলা প্রশাসনের
সুনামগঞ্জে কয়েক দিনের টানা বর্ষণ এবং ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার নদ-নদী ও হাওরাঞ্চলের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ অবস্থায় হাওর এলাকায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করেছে জেলা প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সুরমা নদীসহ জেলার বিভিন্ন নদীর পানি ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে হাওর ও নৌপথে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জেলার সব হাউসবোট মালিক, চালক ও সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তাবিষয়ক নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী, বৈরী আবহাওয়া, ভারী বৃষ্টিপাত, দমকা হাওয়া কিংবা নদীপথে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করলে কোনো অবস্থাতেই পর্যটক নিয়ে যাত্রা করা যাবে না।
প্রতিটি হাউসবোটে ধারণক্ষমতা অনুযায়ী পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় রিং এবং প্রয়োজনীয় জরুরি নিরাপত্তা সরঞ্জাম রাখতে হবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া যাত্রা শুরুর আগে পর্যটকদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশনা জানানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যেকোনো নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্ষা মৌসুমে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য টাঙ্গুয়ার হাওরে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটে। পর্যটকেরা হাউসবোটে অবস্থান করে হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। পাশাপাশি নিলাদ্রী লেক, যাদুকাটা নদী, বারিকটিলা, লাকমাছড়া ও শিমুলবাগানসহ আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলো ভ্রমণ করেন।
তবে চলমান আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় প্রশাসন আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলা প্রশাসন একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করেছে। পাশাপাশি উপজেলার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনকে সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতির অবনতি হলে দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল ৯টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে এটি জেলার সর্বোচ্চ একদিনের বৃষ্টিপাত।
এর আগে গত ২৮ এপ্রিল এক দিনে ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল, যা এবার নতুন রেকর্ডে ছাড়িয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উজান এবং স্থানীয়ভাবে আগামী দুই দিন ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে এবং জেলার নিম্নাঞ্চলে সাময়িক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানের ঢল ও স্থানীয় ভারী বৃষ্টিপাত একসঙ্গে অব্যাহত থাকলে হাওরাঞ্চলের জনজীবন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কৃষিখাতের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মুখে থাকা সুনামগঞ্জে প্রশাসন আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতের ওপর। স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও নৌযান সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।
