ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় ১৮ মাসের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় প্রথম ছয় মাস ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে সমঝোতার সুযোগ রাখা হবে। এরপরের ১২ মাসে সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়ন ও তা কার্যকর করে খেলাপি ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় এ পরিকল্পনার কথা জানান। গতকাল একই কমিটির বৈঠকে ওই সভার কার্যবিবরণী অনুমোদন করা হয়। কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করে তাঁদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মতে, এর মাধ্যমে প্রকৃত ঋণগ্রহীতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
গভর্নর জানান, ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় নীতি সুদহার কমানোর পাশাপাশি খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আমদানি অর্থায়নের ইউপিএএস বা মেয়াদি ঋণপত্রের সুদের মার্জিন বেঞ্চমার্ক ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের সুদের স্প্রেড সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এতে আমদানি ব্যয়, ঋণের সুদহার ও পণ্যের মূল্য কমবে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। একই সময়ে ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা।
রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাংকে বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশ খেলাপি।
সোর্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে ওই সরকারের পতনের আগে তা বেড়ে ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিসংখ্যান প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়, যার ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসে।
সভায় বড় ঋণের পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও উৎপাদনশীল উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ঋণের অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর নজরদারির উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান গভর্নর।
বৈঠকে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, ঋণের কার্যকর সুদের হার শেষ পর্যন্ত ১৮ থেকে ১৯ শতাংশে পৌঁছে যায়—এ বিষয়টি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়।
এ ছাড়া ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়েও আলোচনা হয়। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যাতে এই ঋণ পান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তা যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারেন, সে জন্য তদারকি জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে অগ্রগতি তুলে ধরার কথা রয়েছে।
বৈঠকে প্রতি তিন মাস পরপর মুদ্রানীতি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক ছয় মাস মেয়াদে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে—জানুয়ারি-জুন এবং জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে।
গভর্নর আরও বলেন, দেশের মূল্যস্ফীতির প্রবণতা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
