ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে তার পক্ষ থেকে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যকে ঘিরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে যেমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি এটি বাস্তব প্রস্তুতি নাকি রাজনৈতিক কৌশল—সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে আইনি জটিলতা ও মামলার মুখোমুখি হতে হবে। অন্যদিকে দেশে না ফিরলে দলের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে ঘিরে আওয়ামী লীগের ভেতরে নানা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি দেশে ফিরতে না পারলে ১ জানুয়ারি থেকে তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে তারা মনে করছেন। পরবর্তী সময়ে দেশে ফেরার বিষয়ে নতুন কোনো ব্যাখ্যা দিলেও তা আগের মতো বিশ্বাসযোগ্যতা নাও পেতে পারে বলে তাদের ধারণা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম মনে করেন, শেখ হাসিনার মাঝে-মধ্যে দেশে ফেরার বক্তব্য মূলত দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার কৌশল। তার ভাষ্য, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি সেই আইনি লড়াই ও দেশের বাস্তবতা মোকাবিলা করবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে না ফিরলে ট্রাভেল পাস বা বিমান অবতরণের অনুমতির মতো বিষয় সামনে আনা হতে পারে। তবে এসব ব্যাখ্যা তার রাজনৈতিক অবস্থানের ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না।
রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি না, বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। তার পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমনটা মনে করার যথেষ্ট কারণ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার রায় ও এর বাস্তবায়ন নিয়েও রাজনৈতিক আলোচনা ও উত্তেজনা বাড়তে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার মতো বাস্তব পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ রয়েছে। ফলে দেশে ফিরলে তাকে এসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও দলটির একাংশের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে দলটি আবার রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তিনি না ফিরলে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হবে বলে তারা মনে করছেন।
এ কারণে ঘোষিত সময়েই শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন—এমন আশা করছেন দলটির একাংশ। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক বৈঠকে এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব আলোচনার অংশ হিসেবে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন শীর্ষ নেতার দেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। তার সঙ্গে আরও অনেক নেতাকর্মী দেশে ফিরবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা বিচারাধীন এবং ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত। তার দাবি, ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো উচিত।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে এলে বিমানবন্দরেই তাকে গ্রেফতার করা হবে এবং এরপর রায় কার্যকর করা হবে। ট্রাইব্যুনাল আইনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রায়ের কপি পাওয়ার ৩০ দিন পর আপিলের সুযোগ থাকে না এবং সেই সময়সীমা ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল শেখ হাসিনার দেশে ফেরার রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে পুনরায় সংগঠিত করতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার চিন্তা বাস্তবায়িত হবে—এমন ধারণা তার কাছে অত্যন্ত অসম্ভব মনে হয়।
