জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চসহ ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর নজর রাখছে বিএনপি। একই সঙ্গে এসব কর্মসূচির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দলটির নেতারা। তবে আপাতত বিরোধী দলের কর্মসূচির পাল্টা কোনো কর্মসূচি দেওয়ার কথা ভাবছে না বিএনপি।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার ভাষ্য, সংসদ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে এসব কর্মসূচির জবাব দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের মতে, সরকারে থেকে বিরোধী দলের কর্মসূচির পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার চেয়ে সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে দলের একটি অংশ মনে করে, জনসম্পৃক্ত বিষয় নিয়ে বিরোধীরা ধারাবাহিকভাবে মাঠে থাকলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
জ্বালানি, বিদ্যুৎ-সংকটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো মাঠে কর্মসূচি পালন করছে। ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চের পর আজ রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করছে ১১–দলীয় জোট। পর্যায়ক্রমে খুলনা, সিলেটসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরের দিকেও একই ধরনের কর্মসূচি নেওয়ার ঘোষণা রয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁরা বিরোধী দলের লংমার্চকে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে দেখছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করার অধিকার সবার রয়েছে এবং বিএনপি বিষয়টিকে এর বাইরে অন্যভাবে দেখছে না।
তবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বিএনপির অবস্থান নিয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বিএনপি বিরোধী দলের কর্মসূচিকে গুরুত্ব না দিলে সংসদে তার প্রতিক্রিয়া দেখাত না। তিনি আরও বলেন, সরকারি দলের পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার সক্ষমতা নেই এবং বিএনপির আগের নৈতিক অবস্থানও নেই।
বিরোধীদের ধারাবাহিক কর্মসূচির প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি এখন পর্যন্ত সংসদ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও লংমার্চের উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
জ্বালানি-সংকটের সমাধানে লংমার্চ প্রসঙ্গে সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গাড়ির লংমার্চ করে গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হলে সরকারই আগে এমন কর্মসূচি আয়োজন করত। সরকারি দলের অন্য নেতারাও লংমার্চের যৌক্তিকতা, জ্বালানি-সংকটের বাস্তবতা এবং সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন।
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতারা বলছেন, বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণে এখনই এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, যার জন্য বিএনপিকে পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। তাঁদের মতে, বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার রয়েছে। তবে কোনো কর্মসূচিতে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হলে বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে সরকার পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপির নেতাদের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে রাজনৈতিক কর্মীদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিরোধীদের কর্মসূচিকে এখনই বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে না ক্ষমতাসীন দল। তবে দলের একটি অংশ মনে করে, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও দ্রব্যমূল্যের মতো জনসম্পৃক্ত বিষয়ে বিরোধীরা নিয়মিত কর্মসূচি চালিয়ে গেলে সরকারের অবস্থান জনগণের কাছে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন হতে পারে।
বিরোধী দলগুলো যখন ধারাবাহিক কর্মসূচিতে মাঠে রয়েছে, তখন বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতা তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে দলীয় প্রস্তুতির বড় কোনো কর্মসূচি এখনো দৃশ্যমান নয়। সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে এলাকায় সক্রিয় থাকলেও কেন্দ্রীয়ভাবে মাঠ গোছানোর বড় কোনো কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে না।
ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির দলীয় সংগঠন কতটা সক্রিয় রয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় অংশ মন্ত্রিসভা, সংসদ ও প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় ওই নির্বাচনকে ঘিরে মাঠপর্যায়ে বিএনপি কতটা সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হয়, সেটিও আলোচনায় রয়েছে।
