ফ্রিল্যান্সারদের লক্ষ্য করে অনলাইন মার্কেটপ্লেস ফাইভারে ভুয়া অ্যাকাউন্ট, অর্ডার ও রিফান্ডের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে বেটোপিয়া গ্রুপকে ঘিরে। চাকরির বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ করে তাদের পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে ফাইভারে অ্যাকাউন্ট খোলার অভিযোগও রয়েছে।
যুগান্তরের মাসব্যাপী অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে আকর্ষণীয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের আকৃষ্ট করা হয়। চাকরিতে যোগদানের সময় কর্মীদের কাছ থেকে পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, পরে কর্মীদের অজান্তে এসব তথ্য ব্যবহার করে ফাইভারে অ্যাকাউন্ট খোলা হয় এবং সেসব অ্যাকাউন্ট থেকে ক্লায়েন্টদের বার্তা পাঠানো, কাজের জন্য বিড করা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে তাদের গিগে ভুয়া অর্ডার দেওয়া হয়। পরে এসব অর্ডার বাতিল বা রিফান্ড করে নেওয়া এবং নেতিবাচক রিভিউ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ফ্রিল্যান্সারের পারফরম্যান্স ও র্যাংকিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে নাহিদ ইসলাম নামে এক ফ্রিল্যান্সারের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, একদিন তার অ্যাকাউন্টে দুটি ডিজাইনের অর্ডার আসে। কিছুক্ষণ পরই অর্ডার দুটি বাতিল হয়ে যায়। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তিনি অর্ডারগুলোর তথ্য অনুসন্ধান করেন।
নাহিদের দাবি, বেটোপিয়া গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সফটভেন্সের কর্মীদের অ্যাকাউন্ট থেকে ওই দুটি অর্ডার করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, এর পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তাকে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হয়।
প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মীর বক্তব্যও রয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অনিয়ম নিয়ে একাধিকবার বিরোধের ঘটনা ঘটেছে। এক কর্মী অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তাকে একটি কক্ষে আটকে রেখে মারধর করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
সাবেক কর্মীদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেটোপিয়া প্রতিষ্ঠার আগে একই ধরনের ব্যবসা ‘বিডি কলিং আইটি’ নামে পরিচালিত হতো। মার্কেটপ্লেসের নীতিমালা লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ওই প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক পরিচিতি তৈরি হওয়ার পর নতুন নামে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফায়ার এআই, জেভি এআই, স্পার্কটেক, সফটভেন্স ও এসএম টেকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। এসব বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ফ্রেশারদের ‘ট্রেইনি’ বা ‘ইন্টার্ন’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুলাইয়ের শেষ দিকে বেটোপিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিন শতাধিক অ্যাকাউন্ট একযোগে সাসপেন্ড করে ফাইভার কর্তৃপক্ষ।
প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে তরুণদের ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রতি আগ্রহ ও আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আলীম বলেন, ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে ফেক অ্যাকাউন্ট, ভুয়া অর্ডার বা প্রতিদ্বন্দ্বীর গিগ ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। চাকরি দেওয়ার নামে ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে তা ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খোলা এবং অনৈতিক কাজে ব্যবহার করাকে তিনি গুরুতর বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পুরো ফ্রিল্যান্সিং খাতের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাঁর মতে, তদন্ত করে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগের বিষয়ে বেটোপিয়া গ্রুপের সিইও মনির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠানোর চার দিন পরও কোনো উত্তর না পাওয়ায় আবার যোগাযোগ করা হয়।
এরপর বেটোপিয়ার পিআর ও মিডিয়া মুখপাত্র তানুভীরুল ইসলাম জানান, তারা প্রশ্নগুলো পেয়েছেন এবং সাত কর্মদিবসের মধ্যে উত্তর দেওয়া হবে। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও বেটোপিয়া গ্রুপের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য বা জবাব পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
