সম্পত্তি ও পারিবারিক বিরোধের জেরে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি নারী রেহানা পারভীনকে হত্যার পর মরদেহ গুমের অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) বলা হয়েছে, আশুলিয়ায় একটি বাড়ির সেপটিক ট্যাংকের পাশে মাটি খুঁড়ে রেহানার মরদেহ পুঁতে রাখা হয়। পরে ওই স্থান আড়াল করতে সেখানে সবজির চারা লাগানো হয়েছিল।
রেহানা ২০২৪ সালের ৬ জুন ১৩ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে আসেন। প্রায় তিন সপ্তাহ পর, ২৯ জুন দেশে ফেরেন তার স্বামী আওলাদ হোসাইন। ৩ জুলাই রেহানা তার মায়ের সঙ্গে সর্বশেষ ফোনে কথা বলেন। এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর রেহানার মা আইরিন আক্তার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে ৮ সেপ্টেম্বর তিনি অপহরণের অভিযোগে আওলাদ হোসাইন, তার দুই বোন পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম এবং আত্মীয় আমজাদ হোসাইনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তবে মামলা হওয়ার আগেই আওলাদ অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান।
এরপর ১২ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ায় পাপিয়া আক্তারের বাড়ির সামনে মাটি খুঁড়ে রেহানার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের পর অপহরণের মামলাটি হত্যা ও মরদেহ গুমের মামলায় রূপ নেয়।
তদন্ত শেষে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক তানভীর হাসান খান পাঁচজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে আওলাদ হোসাইন, পাপিয়া আক্তার, মাকসুদা বেগম, আওলাদের চাচাতো ভাই কবীর হোসাইন এবং চাচা আমজাদ হোসাইনকে আসামি করা হয়েছে।
২১ সেপ্টেম্বর মামলার নির্ধারিত তারিখে ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর আহমেদ অভিযোগপত্রটি পর্যালোচনা করেন। পরবর্তী পর্যালোচনার জন্য আগামী ১৯ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন আদালত।
তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান খান জানান, বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া—দুই দেশেই রেহানার সম্পত্তি ছিল। এসব সম্পত্তি নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের পাশাপাশি পারিবারিক নানা বিষয়েও তাদের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় একই বাড়িতে বসবাস করলেও রেহানা ও আওলাদ আলাদাভাবে থাকতেন। বাংলাদেশে আসার পরও তাদের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। এর পরপরই রেহানাকে হত্যার ঘটনা ঘটে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যার পর রেহানাকে আওলাদের বোন পাপিয়া আক্তারের আশুলিয়ার নয়ারহাট চৌরাপাড়ার বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই আমজাদ হোসাইন ও কবীর হোসাইন উপস্থিত ছিলেন।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে রেহানার সঙ্গে আওলাদের বিবাদ হয়। একপর্যায়ে রেহানা ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে পাপিয়া তাকে ধাক্কা দেন। এতে তিনি মেঝেতে পড়ে যান।
এরপর আমজাদ রেহানার দুই পা এবং কবীর দুই হাত ধরে রাখেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় আওলাদ তার ওপর বসে মুখে বালিশ চেপে ধরেন। এতে শ্বাসরোধ হয়ে রেহানার মৃত্যু হয় বলে পুলিশের অভিযোগ।
পুলিশের অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, একই রাতে আওলাদ, আমজাদ, পাপিয়া ও কবীর মিলে বাড়ির সামনের সেপটিক ট্যাংকের পাশে মাটি খুঁড়ে রেহানার মরদেহ পুঁতে দেন। পরে ঘটনাটি আড়াল করতে সেখানে বিভিন্ন সবজির চারা লাগানো হয়।
রেহানা নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের করা সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পরে পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
ঘটনার পর আওলাদ অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে মামলার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য ও প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ পুলিশ সেগুলো সরবরাহ করেছে। আওলাদ অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হলেও তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে রেহানা হত্যার তদন্তকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে অর্থ পাঠানোর অভিযোগে সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় ৫১ বছর বয়সী আওলাদ গ্রেপ্তার হয়েছেন। বর্তমানে তিনি ব্রিসবেন পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।
রেহানার মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশও আলাদাভাবে তদন্ত করছে।
রেহানার মা আইরিন আক্তারের এজাহারে বলা হয়েছে, প্রায় দুই দশক আগে আওলাদ হোসাইনের সঙ্গে রেহানার বিয়ে হয়। তাদের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। সন্তানরা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক।
আইরিনের অভিযোগ, বাংলাদেশে রেহানা নিজের নামে কিছু সম্পত্তি কেনার পর থেকেই আওলাদ এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন এবং বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে নিয়মিত বিরোধ হতো।
মামলার বর্তমান অবস্থায় পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম জামিনে রয়েছেন। আমজাদ হোসাইন ও কবীর হোসাইন কারাগারে আছেন। আওলাদ হোসাইনকে অভিযোগপত্রে পলাতক দেখানো হয়েছে।
