পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতা ও খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদি এখন দলীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। প্রায় ৩৭ মাস ধরে কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত করার দায়িত্বও নিয়েছেন ৩৭ বছর বয়সী এই নেতা।
ইমরানের মুক্তির দাবিতে আগামী ৪ অক্টোবর ইসলামাবাদমুখী দীর্ঘ মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন আফ্রিদি। এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর কর্মসূচিটি এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হয়। আফ্রিদির ভাষ্য, কর্মসূচি পেছানো আত্মসমর্পণ নয়, বরং রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তিনি জানিয়েছেন, যেকোনো পরিস্থিতিতেই ৪ অক্টোবর মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমরান খান কারাগারে থাকায় পিটিআইয়ের আন্দোলন সংগঠনে আফ্রিদির ভূমিকা আগের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাবন্দি ইমরানের মুক্তির দাবিতে এটি হবে দলটির দ্বিতীয় বড় ইসলামাবাদমুখী মিছিল। পিটিআইয়ের দাবি, ইমরানকে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি তার রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
সোহেল আফ্রিদির জন্ম ১৯৮৯ সালের ১২ জুলাই খাইবার পাখতুনখোয়ার বারায়। তিনি পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে পিটিআইয়ের ছাত্রসংগঠন ইনসাফ স্টুডেন্টস ফেডারেশনের মাধ্যমে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
২০২৪ সালের নির্বাচনে বারার একটি আসন থেকে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পিটিআইকে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়ায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন।
২০২৫ সালের অক্টোবরে আলী আমিন গান্দাপুর পদত্যাগ করার পর ইমরান খানের সমর্থনে আফ্রিদি খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনি প্রদেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী মুখ্যমন্ত্রী এবং সাবেক উপজাতীয় অঞ্চল থেকে উঠে আসা প্রথম ব্যক্তি যিনি এই পদে দায়িত্ব নেন।
আগস্টে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়। তবে সরকার তাকে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে নেওয়ায় আফ্রিদি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তিনি আদালতের আদেশ অমান্যের অভিযোগ তুলে বলেন, বিচারকদের আদেশ কার্যকর না হলে পাকিস্তান ‘কলা প্রজাতন্ত্রে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এরপর আফ্রিদির বিরুদ্ধে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর তার বৈধতা নিয়ে আদালতে আবেদন করা হয় এবং একই দিনে সন্ত্রাসবিরোধী আদালত তার পাসপোর্ট আটকের নির্দেশ দেয়। পরে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট ৪ অক্টোবরের মার্চে প্রাদেশিক সরকারের সম্পদ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমরান খানের মুক্তির জন্য আইনি উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হওয়ার পর আগস্টে আফ্রিদি ইসলামাবাদমুখী মিছিলের ঘোষণা দেন। পরে ইমরানের বোনদের আটক, মিছিল ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে রাজধানীতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়।
ইমরানের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার সুযোগ না পেলেও আফ্রিদি তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। ইমরানের বোন উজমা খান জানিয়েছিলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইমরান তাকে আফ্রিদিকে আন্দোলন আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিতে বলেছিলেন।
আফ্রিদির নেতৃত্ব ও পিটিআইয়ের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিয়ে দলের ভেতরে ভিন্নমত রয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ইমরান খানের অনুপস্থিতিতে দলটির নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তবে সাবেক পিটিআই নেতা আসাদ উমর এ ধরনের সংকটের ধারণা নাকচ করে দলীয় নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা রয়েছে বলে দাবি করেছেন।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খাইবার পাখতুনখোয়ায় গভর্নরের শাসন জারির সম্ভাবনা নাকচ করেননি। অন্যদিকে পিটিআই নেতারা এর বিরোধিতা করেছেন। এর মধ্যেও ৪ অক্টোবরের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আফ্রিদি।
ইসলামাবাদমুখী কর্মসূচিকে ঘিরে কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। আফ্রিদির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুলসংখ্যক সমর্থককে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করানো। মার্চের সাফল্য কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নিয়েও দলীয় নেতাদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ বড় জমায়েত ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়াকেই সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছেন।
