কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের যাতায়াত ও ভ্রমণসংক্রান্ত বিধিনিষেধে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পর্যটকদের রাত্রিযাপন ও ভ্রমণের সময়সীমায় পরিবর্তন আসতে পারে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দ্বীপের বাসিন্দা, পরিবেশবিদ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি দ্বীপের বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকার বিষয়ও বিবেচনায় নিয়ে নতুন নির্দেশনা তৈরি করা হবে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের জন্য ১২টি নির্দেশনা জারি করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এসব বিধিনিষেধের কারণে পর্যটন ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে দ্বীপের বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
বর্তমান বিধিনিষেধ অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে পর্যটকদের শুধু দিনের বেলায় দ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে নির্দিষ্টসংখ্যক পর্যটক রাত্রিযাপন করতে পারেন। বর্তমানে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ হাজার পর্যটক রাত্রিযাপনের অনুমতি পান এবং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাদের পাস দেওয়া হয়।
তবে রাত্রিযাপনের ওপর এই বিধিনিষেধ পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা করছে সরকার। পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করে সেন্টমার্টিনে গিয়ে অল্প সময় অবস্থান করে ফিরে আসা পর্যটকদের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। তাই রাত্রিযাপনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ট্যুর অপারেটরদের সংগঠনও রাত্রিযাপনের বিধিনিষেধ পরিবর্তনের পক্ষে। তাদের মতে, কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন যেতে দীর্ঘ সময় ও খরচ হওয়ায় রাত্রিযাপনের সুযোগ না থাকলে পর্যটকরা নিরুৎসাহিত হন।
সেন্টমার্টিনে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের কারণে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার পর্যটক যেতেন। দ্বীপে প্রায় ১৫০টি আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে, যেখানে অন্তত ৫ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
দ্বীপের ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিরা পর্যটন মৌসুম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি, অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সুযোগ রাখা হোক।
তবে পরিবেশবিদদের কেউ কেউ এ দাবির সঙ্গে একমত নন। পরিবেশবিদ মো. শামসুদ্দোহা বলেছেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় পর্যটনের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন এবং ভ্রমণের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা উচিত। তার মতে, এই সময় কোনোভাবেই তিন মাসের বেশি হওয়া উচিত নয়।
আগের নির্দেশনায় সেন্টমার্টিনে আলোকসজ্জাসহ বারবিকিউ পার্টি, রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো ও শব্দ সৃষ্টি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা কেনাবেচা এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ বিভিন্ন জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করাও নিষিদ্ধ ছিল।
সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ মোটরচালিত যানবাহন চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
তবে দ্বীপের জনপ্রতিনিধি ফয়েজুল ইসলাম দাবি করেছেন, বর্তমান বিধিনিষেধ পরিবেশ রক্ষায় প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। তার ভাষ্য, পর্যটক কমে যাওয়ায় জীবিকার তাগিদে কিছু মানুষ গাছ কাটছেন এবং অবাধে মাছ ধরছেন, যা পরিবেশের ওপর আরও চাপ তৈরি করছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থানে থাকার কথা জানিয়েছে। পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করা হবে।
নতুন ব্যবস্থায় পর্যটকদের প্লাস্টিক ও সিঙ্গেল-ইউজ পলিথিন নিয়ে দ্বীপে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। এ নিয়ম বাস্তবায়নে পরিবেশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কোস্টগার্ড সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। জাহাজ ছাড়ার আগে প্লাস্টিক বা পলিথিন রয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন নীতিমালায় সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি দ্বীপের বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকা এবং পর্যটন ব্যবসার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে। আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা শেষে নতুন গাইডলাইন দেওয়ার কথা রয়েছে।
