ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরুর প্রায় সাত মাসের মধ্যেই গুরুতর অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন দুই সংসদ সদস্য—জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে নির্বাচিত গাজী নজরুল ইসলাম এবং বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। তবে দুজনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার ধরন ভিন্ন হয়েছে।
গাজী নজরুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। নৈতিক স্খলনের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামী তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করলেও তাঁর সংসদ সদস্য পদ বহাল রয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ভাঙার ঘটনায় নাম আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
সংসদ সদস্যদের বিতর্কে জড়ানো, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বা পদত্যাগের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন কারণে সংসদ সদস্যদের আসন শূন্য হওয়ার পাশাপাশি দল থেকে বহিষ্কারের নজির রয়েছে।
সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যের আসন কখন শূন্য হবে, তা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের ৯০ দিনের মধ্যে শপথ না নেওয়া, সংসদের অনুমতি ছাড়া টানা ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকা, সংসদ ভেঙে যাওয়া এবং আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হওয়া রয়েছে।
এ ছাড়া দেউলিয়া ঘোষণার পর দায় থেকে অব্যাহতি না পাওয়া, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন বা আনুগত্য স্বীকার এবং নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড পাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্তে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হতে পারে।
কোনো আইন অনুযায়ী নির্বাচনের অযোগ্য হওয়া বা প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রেও আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। এছাড়া কোনো সংসদ সদস্য নিজ দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর আসন শূন্য হয়।
২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বিতর্কিত মন্তব্যের পর তৎকালীন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী মন্ত্রিসভা ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর পদ হারান। পরে তাঁকে দল থেকেও বহিষ্কার করা হয়। দেশে ফেরার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় নয় মাস কারাগারে ছিলেন।
তাঁর সংসদ সদস্য পদ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের চিঠি চালাচালি হয়। পরে শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হলে লতিফ সিদ্দিকী জানান, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন। ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর সংসদে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
অন্যদিকে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে অশ্লীল মন্তব্য ও একটি ফোনালাপ ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য মুরাদ হাসান। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন এবং আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের পদ থেকেও বহিষ্কৃত হন।
তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের দাবি উঠলেও তিনি পদত্যাগ করেননি। সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য পদে বহাল ছিলেন।
২০১৩ সালে বেসরকারি একটি টেলিভিশনের দুই সাংবাদিককে পেটানোর ঘটনায় তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনিকে কারাগারে যেতে হয়েছিল। পরবর্তী নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি। পরে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে দলটির মনোনয়ন পেয়েছিলেন।
অন্যদিকে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুল ২০২০ সালের জুনে কুয়েতে গ্রেপ্তার হন। পরে ঘুষ লেনদেনের মামলায় দেশটির আদালত তাঁকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার জরিমানা করেন।
এরপর ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করে জাতীয় সংসদ সচিবালয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৫ আসন থেকে নির্বাচিত আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপির অভিযোগ তুলে মামলা করা হয়েছিল। হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল তাঁর সংসদ সদস্য ঘোষণা-সংক্রান্ত গেজেট অবৈধ ঘোষণা করেন। পরে আপিল বিভাগ তাঁর আপিল খারিজ করলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যায়।
মহীউদ্দীন খান আলমগীরও দণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থায় নির্বাচনে জয়ী হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতায় পড়েন। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর নির্বাচন কমিশন তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে।
এ ছাড়া ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোলা-৩ আসন থেকে নির্বাচিত মেজর (অব.) জসিমউদ্দিনের প্রার্থিতা নিয়ে আইনি লড়াই হয়। উচ্চ আদালত তাঁর সংসদ সদস্য পদ অবৈধ ঘোষণা করার পর নির্বাচন কমিশন আসনটি শূন্য ঘোষণা করে।
সংবাদপত্রের পুরোনো খবর পর্যালোচনা করে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের তিনটি নজির পাওয়া গেছে।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান ২০০০ সালে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর আসন শূন্য হয়।
সিরাজগঞ্জ-৭ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান (স্বপন) ১৯৯৮ সালে দল থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিলে ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্য পদ হারান।
একই সংসদে রাজশাহী-৫ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আওয়ামী লীগে যোগ দিলে তাঁর আসনও শূন্য হয়। পরে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি আবার সংসদ সদস্য হন।
কোনো রাজনৈতিক দল সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলেই তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়—এমন সরাসরি বিধান সংবিধানে নেই। এ বিষয়ে স্পিকার সিদ্ধান্ত দেন এবং প্রয়োজনে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাতে পারেন।
২০১৮ সালের নির্বাচনের পর সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও জাহিদুর রহমান দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ নেওয়ার পর নিজ নিজ দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। কিন্তু দল থেকে বহিষ্কার তাঁদের সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকার ক্ষেত্রে বাধা হয়নি।
একইভাবে ২০০৮ সালে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয় পার্টির নেতা এইচ এম গোলাম রেজাকে ২০১২ সালে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি। রাজশাহী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবু হেনাকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, কিন্তু তৎকালীন স্পিকার তাঁর সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দেন।
ফলে অতীতের ঘটনাগুলোতে দেখা যায়, সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং সংসদ সদস্য পদ হারানোর বিষয় দুটি সব ক্ষেত্রে একই পরিণতি তৈরি করেনি।
