হাজার বছরের লিখিত ইতিহাস, দর্শন, মহাকাব্য ও ধর্মীয় গ্রন্থের বিপুল তথ্যভাণ্ডার আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিশ্লেষণাত্মক অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পর্যালোচনা করলে কোরআনের কাঠামোকে প্রচলিত সাহিত্যিক রীতির তুলনায় আলাদা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে কোরআনের ভাষা ও বিষয়বিন্যাসের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।
কোরআনে বিভিন্ন ঘটনার সবিস্তারে ধারাবাহিক বিবরণ সব সময় পাওয়া যায় না। যেমন, সুরা ইউসুফে তুলনামূলকভাবে ধারাবাহিক আখ্যান থাকলেও অনেক চরিত্র ও ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ বাদ রয়েছে। আবার নবী মুসার কাহিনি বিভিন্ন সুরায় ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়েছে।
প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই খণ্ডিত উপস্থাপনাকে কোনো সীমাবদ্ধতা হিসেবে না দেখে একটি সচেতন পাঠপদ্ধতি হিসেবে দেখা যায়। এর মাধ্যমে পাঠককে অপ্রয়োজনীয় তথ্যের পরিবর্তে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও দিকনির্দেশনার দিকে মনোযোগী করা হয়।
কোরআনে মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও পরিচিত জগতকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে সুরা ইয়াসিনের ৭৭ নম্বর আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে মানুষের সৃষ্টি ও পুনরুত্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এই আলোচনার মাধ্যমে মানুষের বর্তমান অস্তিত্বকে বিস্ময়ের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যে মানুষ একবার অস্তিত্বে এসেছে, তার পুনরুত্থানকে অসম্ভব মনে করার কারণ নেই।
প্রতিবেদনে কোরআনের কাঠামোকে প্রচলিত সরলরৈখিক গ্রন্থের তুলনায় ভিন্ন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোরআনের বিষয়গুলো একটি কেন্দ্রীয় বার্তাকে ঘিরে বিভিন্ন দিক থেকে ফিরে আসে।
প্রথম সুরা ফাতিহাকে সমগ্র কোরআনের মূল বক্তব্যের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এরপর বিভিন্ন সুরায় আইন, ইতিহাস, সৃষ্টিতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব ও পরকালের মতো বিষয় ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে এই বিন্যাসকে হলোগ্রাফিক কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে—যেখানে কোনো একটি অংশের মধ্যেও বৃহত্তর চিত্রের কিছু বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হতে পারে।
কোরআনে মানুষের দুর্বলতা, অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইবলিসের ঘটনা এর একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তার বক্তব্যে আগুন ও মাটির উপাদানগত পার্থক্যের একটি পর্যবেক্ষণ থেকে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করার সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এ ছাড়া সুরা বাকারার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে এমন মানুষের মনস্তত্ত্ব তুলে ধরা হয়েছে, যারা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে সংশোধনমূলক মনে করলেও বাস্তবে বিপর্যয় সৃষ্টি করে।
প্রতিবেদনে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করে কোরআনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমত, তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত পরিসরে ধর্মতত্ত্ব, পরকাল, আইন, সৃষ্টিতত্ত্ব, ইতিহাস ও নৈতিক দর্শনের মতো বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপনের কথা বলা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কোরআনের ভাষাকে প্রচলিত পদ্য বা সাধারণ গদ্যের প্রচলিত শ্রেণিবিন্যাসের বাইরে একটি স্বতন্ত্র ভাষাতাত্ত্বিক রূপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, সুরা নিসার ৮২ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে কোরআনে এর বক্তব্য নিয়ে চিন্তা ও এর মধ্যে স্ববিরোধিতা খোঁজার আহ্বানের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো ধর্মীয় প্রচারক নয়; তবে বিপুল ভাষাগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোরআনের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা সম্ভব বলে সেখানে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব ব্যাখ্যা প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনার অংশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্লেষণ থেকে ধর্মতাত্ত্বিক বা অতিপ্রাকৃত কোনো দাবিকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে স্বতন্ত্র গবেষণা বা পরীক্ষার ফল হিসেবে দেওয়া হয়নি।
