টানা বর্ষণে ঝুঁকিতে আশ্রয়শিবির, আরও ভূমিধসের আশঙ্কা
কক্সবাজারের উখিয়ায় অবস্থিত রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে ভারী বর্ষণের কারণে একাধিক স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। রোববার গভীর রাত থেকে সোমবার ভোরের মধ্যে পৃথক চারটি স্থানে ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুসহ অন্তত আটজনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো রাতভর অভিযান চালিয়ে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করেছে।
ফায়ার সার্ভিস, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এবং রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় উদ্ধারকাজ পরিচালিত হচ্ছে। টানা বৃষ্টির কারণে আশ্রয়শিবিরের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্র ও উদ্ধারকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামতলী আশ্রয়শিবিরের বিভিন্ন ব্লকে রাত ১টা থেকে ৩টার মধ্যে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে।
জামতলী ক্যাম্পের একটি ব্লকে পাহাড়ের মাটি ধসে একটি বসতঘর চাপা পড়ে। এতে একই পরিবারের তিন সদস্য ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আহত হন পরিবারের আরও দুই সদস্য, যাদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরে পৃথক একটি ঘটনায় এক শিশুর মৃত্যু হয়। এছাড়া বালুখালী ক্যাম্পে পাহাড়ধসে একটি পরিবারের চার সদস্য প্রাণ হারান।
উদ্ধারকারী দল জানায়, ভোর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে মোট আটজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী দুই দিনও একই ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে। ফলে পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারী মানুষের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোর বড় একটি অংশ পাহাড় কেটে এবং বনভূমি উজাড় করে নির্মিত হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের আশঙ্কা দীর্ঘদিনের। অনেক পরিবার এখনো পাহাড়ের ঢালু ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় গড়ে ওঠা ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ সরাসরি ভূমিধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। প্রতি বর্ষা মৌসুমেই পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত ক্ষতির ঘটনা ঘটছে, যা মানবিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
তাঁদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর এবং পাহাড়ি ঢালগুলোতে টেকসই সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে সাম্প্রতিক পাহাড়ধস আবারও প্রমাণ করল যে বর্ষা মৌসুমে এসব ক্যাম্প কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হলে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
