ডিজিটাল দক্ষতা বাড়িয়ে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সরকারের নতুন উদ্যোগ
দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সারাদেশে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের সপ্তম ব্যাচের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উদ্যোগে পরিচালিত এই কর্মসূচির আওতায় দেশের ৬৪ জেলার মোট ৪ হাজার ৮০০ তরুণ-তরুণী তিন মাসব্যাপী প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
গত ১ জুলাই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। এ সময় মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণের ফলে দক্ষ ফ্রিল্যান্সারদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সেই চাহিদা পূরণে বাংলাদেশের তরুণদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে, যাতে তারা দেশীয় ও বৈশ্বিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারেন।
প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে টিকে থাকতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণরা শুধু আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগই তৈরি করবেন না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমেও জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চার বছর মেয়াদি এই কর্মসূচির জন্য মোট ৩৭৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ৩৬ হাজার শিক্ষিত যুবক-যুবতীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা।
২০২৫ সালের শুরু থেকে কার্যক্রম চালু হওয়ার পর ইতোমধ্যে ছয়টি ব্যাচের ১৯ হাজার ২০০ প্রশিক্ষণার্থী কোর্স সম্পন্ন করেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে কাজ করছেন বলে জানানো হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অংশগ্রহণকারীরা এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার আয় করেছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় তাদের মোট উপার্জন ৩৪ কোটিরও বেশি টাকা ছাড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই আয় শুধু ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নই নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
সপ্তম ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থীরা তিন মাসে মোট ৬০০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন। প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে পরিচালিত এই কোর্সে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—
- কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন
- ডিজিটাল মার্কেটিং
- গ্রাফিক ডিজাইন
- ভিডিও এডিটিং
- ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন মার্কেটপ্লেস ব্যবস্থাপনা
- সফট স্কিল উন্নয়ন
- বেসিক ইংরেজি
- স্মার্টফোনভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং
প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের সনদপত্র প্রদান করা হবে। পাশাপাশি তাদের পেশাগত উন্নয়নে মেন্টরিং সুবিধাও দেওয়া হবে।
এবারের ব্যাচে অংশ নিতে লক্ষাধিক আবেদন জমা পড়ে। প্রাথমিক যাচাইয়ের পর প্রায় ৭০ হাজার আবেদনকারী লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান। পরবর্তীতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে ৪ হাজার ৮০০ জনকে নির্বাচিত করা হয়।
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য বয়সসীমা ১৮ থেকে ৩৫ বছর এবং ন্যূনতম এইচএসসি পাস হতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত বেকারত্ব মোকাবিলায় দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং খাত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের বিকল্প ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল সেবার বাজার সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ ফ্রিল্যান্সারের চাহিদাও বাড়ছে। সরকারের এই বৃহৎ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ তৈরি করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
