অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তে পরিবারের তীব্র আপত্তির মুখে পড়েছিলেন তেলেগু অভিনেত্রী ভাগ্যশ্রী বোর্সে। তিনি জানান, মা শুধু সিদ্ধান্তের বিরোধিতাই করেননি, টানা ছয় মাস তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগও রাখেননি; এমনকি হোয়াটসঅ্যাপেও ব্লক করে দিয়েছিলেন। তবে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আজ তিনি ১০০ কোটি রুপি বাজেটের একটি সফল সিনেমার নায়িকা।
সম্প্রতি কলেজশিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত ‘অনেস্ট টাউন হল’ অনুষ্ঠানে নিজের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ‘লেনিন’খ্যাত এই অভিনেত্রী। তিনি বলেন, অভিনয়ে আসার সিদ্ধান্ত জানালে পরিবারের কেউই প্রথমে সমর্থন দেননি।
ভাগ্যশ্রীর ভাষ্য, প্রথমে মায়ের কাছে অনুমতি চাইলে তিনি রাজি হননি। পরে বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও একই উত্তর পান। এমনকি বোনও তাঁর পাশে দাঁড়াননি। পরিবারের সবাই তাঁকে অভিনয়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বলেছিলেন।
তবে তিনি মনে করেন, পরিবারের এই আপত্তির পেছনে ছিল উদ্বেগ ও ভালোবাসা। তাঁর কথায়, সিনেমা জগত সম্পর্কে বাইরে থেকে মানুষের নানা আশঙ্কা থাকে। মা-বাবার ভয় ছিল, ছোট মেয়েকে হয়তো অনিরাপদ পরিবেশে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। এখন তিনি উপলব্ধি করেন, অভিভাবক হিসেবে এমন উদ্বেগ স্বাভাবিক।
সব বাধা সত্ত্বেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি ভাগ্যশ্রী। তিনি বলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে ‘চেষ্টা করলে হয়তো পারতাম’—এমন আফসোস করতে চাননি। তাই নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর পরিবারের অজান্তেই অডিশন দেওয়া শুরু করেন তিনি। সেই সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অভিনেত্রী জানান, মা তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে ব্লক করে দেন এবং টানা ছয় মাস কোনো কথাও বলেননি। যদিও সময়টা ছিল অত্যন্ত কঠিন, তবু তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন তাঁর কাজই পরিবারের মন জয় করবে।
ভাগ্যশ্রী বলেন, তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল এমন কিছু করা, যাতে মা-বাবা একদিন তাঁর জন্য গর্ববোধ করেন। মানুষ যেন তাঁদের কাছে তাঁর কাজের প্রশংসা করে—এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।
অনুষ্ঠানে আর্থিক স্বাধীনতার গুরুত্ব নিয়েও কথা বলেন এই অভিনেত্রী। শৈশবের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, একবার ২০০ রুপির একটি স্যান্ডেল কিনে দিতে বাবার কাছে অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু বাবা সেটি কিনে দিতে পারেননি। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে দুটি শিক্ষা দিয়েছে—দরাদরি করতে জানতে হবে এবং নিজের প্রয়োজনের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না।
বিশেষ করে তরুণীদের উদ্দেশে ভাগ্যশ্রীর পরামর্শ, প্রত্যেক নারীর নিজের আয়, নিজস্ব ব্যাংক হিসাব এবং সম্ভব হলে নিজের একটি বাড়ি থাকা উচিত। তাঁর মতে, আর্থিক স্বনির্ভরতা আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার অনুভূতি বাড়ায়।
প্রথম পারিশ্রমিক কীভাবে ব্যয় করেছিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, নিজের জন্য কিছু কেনার আগে মা-বাবার জন্য উপহার কিনেছিলেন। তাঁর ভাষায়, নিজের ক্ষেত্রে খরচ করতে দ্বিধা থাকলেও পরিবারের জন্য ব্যয় করতে কখনো সংকোচ বোধ করেন না।
আলাপচারিতায় নিজের শৈশবের আর্থিক সংগ্রামের কথাও তুলে ধরেন ভাগ্যশ্রী। তিনি জানান, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই অনিশ্চয়তা দেখেছেন। মা-বাবা সন্তানদের ভালো ভবিষ্যৎ দিতে নিরন্তর চেষ্টা করলেও নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁদের।
সবচেয়ে বেশি নাড়া দেওয়া একটি স্মৃতির কথা উল্লেখ করে অভিনেত্রী বলেন, ছোটবেলায় তিনি দেখেছিলেন, তাঁর বাবা কারও কাছে কাজের অনুরোধ করছেন এবং বলছেন, “দয়া করে আমাকে একটা কাজ দিন। আমার দুটি মেয়ে আছে।” সেই দৃশ্যই তাঁকে জীবনে সফল হওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তাঁর লক্ষ্য ছিল, বাবাকে আর কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না দেওয়া।
মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গবাদে জন্ম নেওয়া ভাগ্যশ্রীর শৈশবের একটি বড় অংশ কেটেছে নাইজেরিয়ার লাগোসে। পরে ভারতে ফিরে মুম্বাইয়ে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি মডেলিং শুরু করেন। ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হলেও ২০২৪ সালে রবি তেজার বিপরীতে ‘মিস্টার বচ্চন’ ছবিতে প্রথম নায়িকা হিসেবে আলোচনায় আসেন।
এরপর বিজয় দেবরাকোন্ডার ‘কিংডম’, দুলকার সালমানের ‘কান্থা’ এবং রাম পোথিনেনির ‘আন্ধ্র কিং তালুকা’ ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। সামনে শিবকার্তিকেয়নের বিপরীতে তামিল ছবি ‘সেয়ন’-এ দেখা যাবে তাঁকে। সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ‘লেনিন’ ছবিতে অখিল আক্কিনেনির বিপরীতে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন ভাগ্যশ্রী। ১০ জুলাই মুক্তি পাওয়া ১০০ কোটি রুপি বাজেটের এই সিনেমাটি বক্স অফিসেও সফলতা অর্জন করছে।
