একসময় ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অ্যাকশন অভিনেতা ও খলচরিত্রের পরিচিত মুখ ছিলেন ইলিয়াস কোবরা। প্রায় চার দশকের অভিনয়জীবনে পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর এখন তিনি স্থায়ীভাবে ফিরে এসেছেন জন্মভূমি কক্সবাজারের টেকনাফে। বর্তমানে কৃষিকাজ, খামার পরিচালনা, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ও সমাজসেবার মধ্য দিয়েই কাটছে তাঁর দিন।
সম্প্রতি টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীয়াপাড়ায় নিজের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘ইলিয়াস কোবরা বাজারে’ কথা বলেন এই অভিনেতা। তিনি জানান, চলচ্চিত্রে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর এখন আর সেই জীবনে ফেরার ইচ্ছা নেই।
ইলিয়াস কোবরা বলেন, “৪০ বছর সিনেমা করেছি। পাঁচ শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছি। এখন আর সেই জীবনে ফিরতে চাই না। বাকি সময়টা গ্রামেই থাকতে চাই। কৃষিকাজ, ইবাদত আর মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে সেটাই আমার শান্তি।”
বাহারছড়া ইউনিয়নের পাকা সড়কের পাশে বর্তমানে গড়ে উঠেছে ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’, যেখানে প্রায় ৪৫টি দোকান রয়েছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি স্থানীয় মাছ, শাকসবজি, পান-সুপারি, নারকেল ও মৌসুমি ফল বিক্রি হয়।
স্থানীয় দোকানি নুরুল ইসলাম জানান, আগে এলাকার মানুষকে কেনাকাটা ও কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের টেকনাফ সদরে যেতে হতো। বাজারটি চালু হওয়ার পর সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ ও মানব পাচারের ঘটনার কারণে ক্রেতার সংখ্যা কমেছে।
বাজারটির নামকরণ সম্পর্কে ইলিয়াস কোবরা বলেন, গ্রামের নাম নোয়াখালীয়াপাড়া হওয়ায় অনেকেই বিভ্রান্ত হতেন। ২০১৫ সালে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁর অনুমতি নিয়ে বাজারটির নাম ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’ রাখেন। শুরুতে একটি মুদি দোকান দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও এখন সেখানে ৪৫টির বেশি দোকান রয়েছে।
গ্রামে ফিরে এসে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন এই অভিনেতা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাহারছড়ার পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও মানব পাচারের ঘটনা বেড়েছে।
তিনি বলেন, “দু-এক দিন পরপর পাহাড় থেকে এসে সন্ত্রাসীরা মানুষ তুলে নিয়ে যায়। কয়েক দিন আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করে। এটা গ্রামের মানুষের জন্য বড় আতঙ্ক।”
পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয়দের চারটি দলে ভাগ করে প্রায় ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক পালাক্রমে গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন বলে জানান তিনি। এতে অপহরণের ঘটনা কিছুটা কমেছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে।
১৯৬১ সালের ২০ জানুয়ারি টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীয়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ ইলিয়াস, যিনি চলচ্চিত্রে ইলিয়াস কোবরা নামে পরিচিত। অভিনয়ে আসার আগে তিনি মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক ছিলেন এবং টেকনাফ, কক্সবাজার ও ঢাকায় প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিচালনা করেছেন।
১৯৮৭ সালে চিত্রনায়ক ও পরিচালক সোহেল রানার পরিচালনায় ‘মারুফ শাহ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। পরবর্তী সময়ে প্রায় পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। নব্বইয়ের দশকে মার্শাল আর্টভিত্তিক অ্যাকশন সিনেমায় খলনায়ক চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ‘ভাইয়া নাম্বার ওয়ান’ চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ শিল্পী সমিতির নির্বাচনে তিনি সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
বর্তমানে ইলিয়াস কোবরা স্থানীয় সাগরপাড় জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর উদ্যোগে মসজিদ পুনর্নির্মাণ, কবরস্থান সম্প্রসারণ এবং একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জমি কেনা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গ্রামেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন তিনি। তবে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়মিত ঢাকা ও টেকনাফে যাতায়াত রয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ইলিয়াস কোবরা বলেন, “গ্রামের প্রতি টান সব সময়ই ছিল। সিনেমার ব্যস্ততার মধ্যেও সুযোগ পেলেই চলে আসতাম। এখন স্থায়ীভাবে আছি। মানুষের কথা শুনি, সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করি। আমার দ্বারা যদি কারও উপকার হয়, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
