বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে একসময় রংপুর অঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পড়ে থাকত অনাবাদি। একই সময়ে কৃষিশ্রমিকদেরও কাজের সংকট দেখা দিত। তবে আউশসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের আবাদ বাড়ায় সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। বছরে মাঝের সময়টুকুও কৃষিকাজের আওতায় আসায় জমির ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি কৃষিশ্রমিকদের কাজের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলায় আউশ এখন বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়কে কাজে লাগানোর গুরুত্বপূর্ণ ফসল। কৃষকদের আগ্রহ ও চাষের বিস্তারের সঙ্গে গত কয়েক বছরে এ অঞ্চলে আউশের আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় আউশের আবাদ হয়েছিল ২৪ হাজার ৯৮৮ হেক্টর জমিতে। ওই বছর হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ২ দশমিক ৯৮ মেট্রিক টন এবং মোট উৎপাদন হয়েছিল ৭৩ হাজার ৬৫৬ মেট্রিক টন।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে আবাদ বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৬১৮ হেক্টরে। ওই বছর হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ৩ দশমিক ০৪ মেট্রিক টন এবং উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ৪৭৮ মেট্রিক টন।
২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৭ হাজার ৭৭৬ হেক্টর এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬০ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে আউশ চাষ হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২১-২২ সালে ৬২ হাজার ৯০ হেক্টর, ২০২২-২৩ সালে ৬৩ হাজার ৬৮০ হেক্টর এবং ২০২৩-২৪ সালে ৬১ হাজার ৭৮২ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ করা হয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬১ হাজার ১৫৭ হেক্টর জমিতে আউশ চাষ হয় এবং উৎপাদন দাঁড়ায় ১ লাখ ৮০ হাজার ২৬৮ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদ সামান্য বেড়ে ৬১ হাজার ১৬৩ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ০২ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরে মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭১২ মেট্রিক টন।
অর্থাৎ, ৯ বছরের ব্যবধানে এ অঞ্চলে আউশের আবাদ বেড়েছে ৩৬ হাজার ১৭৫ হেক্টর। একই সঙ্গে ফলনেও উন্নতি হয়েছে।
রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ব্রি-৪৮, ব্রি-৯৮, বিনা-২১, ধানী গোল্ড, গোল্ডেন-১ ও জনকরাজসহ অন্তত ৩০ ধরনের আউশ ধান চাষ হচ্ছে।
কৃষকদের ভাষ্য, বোরো কাটার পর আমন চাষ শুরুর আগ পর্যন্ত একসময় কাজের অভাব ও আয়-রোজগারের সংকট দেখা দিত। আউশসহ স্বল্পমেয়াদি ও মৌসুমি ফসলের আবাদ বাড়ায় এখন বছরের বিভিন্ন সময়ে জমি চাষের আওতায় আসছে। এতে কৃষকদের পাশাপাশি কৃষিশ্রমিকদেরও কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গঙ্গাচড়ার কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে তাঁদের এলাকায় কাজের সংকট ছিল। এখন আউশসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ বাড়ায় ওই সময়েও জমিতে কৃষিকাজ হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও তাঁদের এলাকাকে ‘মঙ্গা এলাকা’ বলা হতো, কিন্তু এখন বছরের কোনো সময়ই তাঁরা বসে থাকেন না।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কৃষক আবুল হোসেন বলেন, বোরো কাটার পর জমি ফেলে না রেখে আউশ চাষ করা যায়। এতে একই জমি থেকে অতিরিক্ত আরেকটি ফসল পাওয়া যায়। তাঁর মতে, আউশ চাষে পরিশ্রম ও খরচ তুলনামূলক কম এবং মোটামুটি লাভও পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, এক একর জমিতে আউশ ধান উৎপাদনে বীজ, বীজতলা, সার, চারা, সেচ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও মাড়াইসহ মোট খরচ প্রায় ৫২ হাজার ৫১২ টাকা। এক একরে ধানের উৎপাদন ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৩০ কেজি। খড়ের মূল্য বাদ দিলে ধানের নিট উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ হাজার ৯১২ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৯ টাকা।
কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি ধান ৩৪ টাকা দরে বিক্রি হলে একরপ্রতি মুনাফা প্রায় ৪ হাজার ৭০০ টাকা হতে পারে। তবে সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। আবার ধান কাটার মৌসুমে বাজারদর কমে গেলে লাভ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, আউশের আবাদ আরও বাড়াতে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মানসম্মত বীজ ও সার সহজলভ্য করা এবং কৃষি উপকরণে ভর্তুকি বা প্রণোদনা দেওয়া গেলে কৃষকদের আগ্রহ আরও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।কৃষি বিভাগের সহযোগিতা
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, এ অঞ্চলের কৃষিতে বড় পরিবর্তনের একটি দিক হলো বছরের মাঝের সময়টুকুও এখন আগের মতো পুরোপুরি অনাবাদি থাকছে না। আউশসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল ওই সময়কে উৎপাদনের আওতায় নিয়ে এসেছে। ফলে জমির ব্যবহার ও কৃষিকাজের পরিধি দুটিই বেড়েছে।
তিনি বলেন, আউশ স্বল্পমেয়াদি ফসল হওয়ায় বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে এটি চাষ করা যায়। উন্নত জাত নির্বাচন, সময়মতো চাষ, সুষম সার প্রয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফলন আরও বাড়াতে কৃষকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে।
