আর্থিক সংকটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় একটি প্যাথলজি ক্লিনিকে চাকরি করেছিলেন কক্সবাজারের নীলা ওয়ান রাখাইন। সেই সংগ্রামী পথ পেরিয়ে এবার যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির সুযোগ পেয়েছেন তিনি। পাঁচ বছরের পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষা বিষয়ে গবেষণা করতে আগামী ১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন এই মেধাবী শিক্ষার্থী।
কক্সবাজারের নীলা ওয়ান রাখাইন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। সম্প্রতি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেমসন ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি এবং কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডির সুযোগ পান। এর মধ্যে পাঁচ বছরের পূর্ণ অর্থায়নের কারণে তিনি ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিকে বেছে নিয়েছেন। সেখানে তাঁর গবেষণার বিষয় হবে টিচিং অ্যান্ড লার্নিং।
নীলা ওয়ান কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। তাঁর বাবা মংফ্রুথেন রাখাইন পেশায় একজন দরজি এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ভর্তি কোচিং করার সুযোগ না পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় একটি প্যাথলজি ক্লিনিকে চাকরি নেন নীলা। মাসে প্রায় চার হাজার টাকা আয় করে তিনি একদিকে পরিবারের খরচে সহযোগিতা করেছেন, অন্যদিকে ভর্তি পরীক্ষার ব্যয়ও সঞ্চয় করেছেন।
সংগ্রামের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে নীলা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই নানা ধরনের কথা শুনতে হয়েছে। এক আত্মীয় আমার মাকে বলেছিলেন, ‘মেয়েকে এত পড়াশোনা করিয়ে কী হবে? শেষ পর্যন্ত তো সংসারই করবে।’ কথাগুলো আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। তবে আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি, মানুষ যা–ই বলুক, কাজ দিয়েই তার জবাব দিতে হবে। এই বিশ্বাসই আমাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।”
বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে ৩ দশমিক ৪৫ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করার পর এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে শিক্ষা বিষয়ে ৩ দশমিক ৫২ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করেন।
শিক্ষাদানের প্রতি আগ্রহের কারণে টিউশনের পাশাপাশি তিনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পাঠদান, শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি এবং মিয়ানমারের শিক্ষার্থীদের অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। এসব অভিজ্ঞতাই তাঁকে শিক্ষা গবেষণার দিকে আরও আগ্রহী করে তোলে।
পিএইচডির প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নীলা দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে গবেষণার জন্য প্রস্তুত করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলাদেশ রাখাইন স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, অঙ্গন এবং রঁদেভু শিল্পী গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে নেতৃত্ব, যোগাযোগ ও দলগত কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত অবস্থায় তাঁর বিয়ে হয়। স্বামী নি জ রাখাইনের সহযোগিতাকে নিজের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে নীলা বলেন, “আমার পুরো যাত্রায় আমার স্বামী আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। বিয়ের পর যৌথ পরিবারে থেকেও পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। তবে স্বামী ও বাবার অনুপ্রেরণায় আমি নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসিনি।”
স্নাতকোত্তরের শেষ সেমিস্টারে ইউনিসেফের একটি প্রকল্পে শিক্ষক প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন নীলা। পরে ইউনিসেফ ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও একই দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম ১০ মিনিট স্কুলে ইংরেজি প্রশিক্ষক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবেও কাজ করেছেন।
নিজ সম্প্রদায়ের শিশুদের মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে তিনি ‘চালুং একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে আদিবাসী শিশুদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে নীলা ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিতে টিচিং অ্যান্ড লার্নিং, ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে কারিকুলাম অ্যান্ড ইন্সট্রাকশন এবং কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটিতেও একই বিষয়ে পিএইচডির সুযোগ পান। ক্লেমসন ইউনিভার্সিটির পূর্ণ বৃত্তি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে আগামী ১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন তিনি।
উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করতে চান নীলা ওয়ান রাখাইন। বিশেষ করে আদিবাসী শিক্ষার্থী এবং মেয়েদের মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে অবদান রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি বলেন,
“আমি দেশ ছেড়ে যাচ্ছি দেশের জন্যই কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে। পিএইচডি শেষে দেশে ফিরে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে চাই। বিশেষ করে আদিবাসী শিক্ষার্থী ও মেয়েদের মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে কাজ করার ইচ্ছা আছে। আমি নিজেও একজন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য। তাই জানি, তাঁদের কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। পাশাপাশি আমি চাই, ভবিষ্যতে কোনো মেয়েকে যেন শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে না হয়।”
