গাজীপুরের জয়দেবপুরে ডোবার পানিতে সুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তায় পাওয়া নারীর দ্বিখণ্ডিত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই বলছে, নিহত ডলি আক্তার (৩০) পাঁচ বছর ধরে মিশন ইসলামের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে ছিলেন। বিয়ে নিয়ে বিরোধ ও আগের বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে মিশন তাঁকে হত্যা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মিশন ইসলাম (২২), তাঁর মা বানু আক্তার (৪৩) এবং মিশনের বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টন (২৪)। পিবিআই জানিয়েছে, তিনজনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে জয়দেবপুর থানার ভবানীপুর এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে একটি খালের পানিতে ব্রিফকেস ও প্লাস্টিকের বস্তা ভাসতে দেখা যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সেগুলোর ভেতর থেকে এক নারীর খণ্ডিত ও অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে।
ঘটনাটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পিবিআই গাজীপুর জেলা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তদন্ত শুরু করে। ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে। এরপর প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্রের সহায়তায় অনুসন্ধান চালানো হয়। একপর্যায়ে নিহত নারীর পরিচয় ও হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ঘটনা শনাক্ত করা হয়।
পিবিআইয়ের তদন্ত ও আসামিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, ডলি আক্তার ও মিশন ইসলামের প্রায় পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। একই গার্মেন্টসে চাকরির সুবাদে তাঁদের পরিচয় হয়। ডলি প্রায়ই মিশনের ভাড়া বাসায় যাতায়াত করতেন।
গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ডলি মিশনের বাসায় যান। সেখানে মিশন, তাঁর মা বানু আক্তার ও ডলি একসঙ্গে খাবার খান। পরে বানু পাশের কক্ষে গেলে মিশন ও ডলি একই কক্ষে ছিলেন। পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্বের বিভিন্ন বিষয় ও বিয়ে নিয়ে বিরোধের কারণে মিশনের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। একপর্যায়ে তিনি ডলিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন।
পিবিআই জানিয়েছে, ওই রাতে ডলি ঘুমিয়ে পড়ার পর মিশন তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে লাশটি চৌকির নিচে রাখা হয়। পরদিন সকালে বানু আক্তার লাশটি দেখতে পান। এরপর লাশ গুম করার পরিকল্পনা করা হয়।লাশ গুমের চেষ্টা
লাশটি সুটকেসে রাখার চেষ্টা করা হলেও পুরোটা সেখানে না ধরায় সেটিকে দুই অংশ করা হয় বলে পিবিআই জানিয়েছে। একাংশ সুটকেসে এবং অপরাংশ প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা হয়।
এরপর মিশন তাঁর বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টনকে বাসা পরিবর্তনের কথা বলে ডেকে আনেন। মিল্টন সুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় তুলে দিতে সহযোগিতা করেন। পরে মিশন, তাঁর মা ও মিল্টন সেগুলো নিয়ে প্রথমে রাজেন্দ্রপুর এবং সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় ভবানীপুর এলাকায় যান। সেখান থেকে মিশন ও মিল্টন সুটকেস ও বস্তা খালের পানিতে ফেলে দেন। পরে মিল্টন জানতে পারেন, সেগুলোর ভেতরে ডলি আক্তারের লাশ রয়েছে।
নিহত ডলির বড় ভাই সোহেল ১২ সেপ্টেম্বর জয়দেবপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও লাশ গুমের মামলা করেন। মামলাটি তদন্তে নেওয়ার পর পিবিআই সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করে।
ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে গাজীপুর মহানগরের সদর মেট্রো থানাধীন বাহাদুরপুর তুলসীভিটা এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে মিল্টনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পৃথক একটি ভাড়া বাসা থেকে মিশন ও তাঁর মা বানু আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আসামিদের দেওয়া তথ্য ও তাঁদের দেখানো জায়গা থেকে মিশনের ভাড়া বাসা থেকে একটি বটি দা, লাশ প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত স্কচটেপের অবশিষ্টাংশ, ডলি আক্তারের জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যবহৃত বাটন মোবাইল ফোন ও এক জোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়েছে। সুটকেস কেনার বিষয়ে তথ্যের পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করেছে পিবিআই।
পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, লাশটি অজ্ঞাত ও অর্ধগলিত অবস্থায় থাকায় শুরুতে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন ছিল। পরে ক্রাইমসিন বিশ্লেষণ, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্রের সমন্বিত ব্যবহারে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই গাজীপুরের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গ্রেপ্তার তিন আসামিই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার তদন্ত এখনো চলছে। হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত কি না এবং উদ্ধার করা আলামত ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
