নরসিংদীর সাসেক ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা পুনঃপরীক্ষা করে প্রায় সাড়ে ৪ একর জমি বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগম। একটি ভূমি অধিগ্রহণ মামলায় প্রস্তাবিত ১৪ একর ২৬ দশমিক ৩৮ শতক জমি কমিয়ে শেষ পর্যন্ত ৯ একর ৮৫ দশমিক ১৫ শতক নির্ধারণ করা হয়। এতে অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় ১১০ কোটি ৩৯ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৪ টাকা কমে যায় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
যুগান্তরের অনুসন্ধানে ওই প্রকল্পের একটি ভূমি অধিগ্রহণ মামলার নথি পর্যালোচনায় জমির প্রয়োজনীয়তা, সড়কের অ্যালাইনমেন্ট ও স্থাপনার পরিমাপ নিয়ে বিভিন্ন অসংগতি উঠে এসেছে। এসব নথির ভিত্তিতেই মাহমুদা বেগমের বদলির পেছনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এলএ কেস ০৯/২১-২২-এর জন্য সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) প্রথমে ১৪ একর ২৬ দশমিক ৩৮ শতক জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেয়। পরে জমির প্রয়োজনীয়তা এবং যৌথ তদন্তের ফিল্ডবহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় মাহমুদা বেগমকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্তের পর প্রস্তাবিত জমি থেকে ৩ একর ১২ দশমিক ৯২ শতক বাদ দেওয়া হয়। এতে জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ একর ১৩ দশমিক ৪৬ শতক। পরবর্তী যাচাই ও অ্যালাইনমেন্ট সংশোধনের পর চূড়ান্তভাবে ৯ একর ৮৫ দশমিক ১৫ শতক জমি অধিগ্রহণের জন্য রাখা হয়।
অর্থাৎ শুরুতে প্রস্তাবিত জমির তুলনায় শেষ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ একর জমি বাদ পড়ে। নথি অনুযায়ী, এর ফলে অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় ১১০ কোটি ৩৯ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৪ টাকা কমে যায়।
কারারদি মৌজায় গুগল আর্থের মাধ্যমে তৈরি খসড়া অ্যালাইনমেন্ট নিয়েও তদন্তে প্রশ্ন ওঠে। নথিতে কোথাও সড়কের প্রস্থ ১৬০ ফুট, আবার কোথাও ১৮০ ফুট পর্যন্ত দেখানোর তথ্য পাওয়া যায়।
প্রস্তাবিত অ্যালাইনমেন্টের বিভিন্ন স্থানে সিএনজি স্টেশন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, দোকানপাট ও বহুতল ভবন ছিল। তদন্তে দেখা যায়, এসব স্থাপনার অনেকগুলো সওজের আগে অধিগ্রহণ করা জমির অ্যালাইনমেন্ট থেকে প্রায় ১০ ফুটের মধ্যে রয়েছে।
এ কারণে আগে অধিগ্রহণ করা জমি ব্যবহার করে সড়ক উন্নয়ন করা সম্ভব কি না, তা পুনরায় যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। পরে গত ৭ জানুয়ারির তদন্ত প্রতিবেদনে অপ্রয়োজনীয় জমি বাদ দিয়ে আগে অধিগ্রহণ করা সওজের জমিতে সড়ক উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়।
তদন্তে বিসিক শিল্পনগরীর সরকারি জমি ও অবকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিসিকের নামে থাকা সরকারি জমি ও অবকাঠামো ফিল্ডবহিতে বিসিকের নামে না দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট লিজগ্রহীতা শিল্পমালিকদের নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে জমির মালিকানা এবং স্থাপনার প্রকৃত মালিকানা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরকারি জমি ও অবকাঠামোর পরিচয় সঠিকভাবে উল্লেখ না হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবি নিয়ে পরবর্তী সময়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে এসব জমির মালিকানা, লিজের ধরন ও স্থাপনার প্রকৃত মালিকানা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ভূমির পাশাপাশি অধিগ্রহণের আওতায় থাকা বিভিন্ন স্থাপনার পরিমাপ নিয়েও অভিযোগ পাওয়া গেছে। দক্ষিণ নোয়াদিয়া, ব্রাহ্মণদী, লামপুর, শাষপুর, কুমড়াদি, মুনসেফচর ও কামারগাঁওসহ কয়েকটি মৌজায় বিভিন্ন অবকাঠামোর পরিমাপ বাস্তবতার তুলনায় বেশি দেখানো হয়েছে বলে তদন্তে অভিযোগ উঠে আসে।
স্থাপনার আয়তনের ওপর ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ভর করে। ফলে পরিমাপে ভুল বা অসংগতি থাকলে সরকারের ক্ষতিপূরণ ব্যয় বাড়ার সুযোগ থাকে।
নথিতে জমির প্রয়োজনীয়তা পুনঃপরীক্ষা এবং অপ্রয়োজনীয় জমি বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় মাহমুদা বেগমের ভূমিকার কথা প্রতীয়মান হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পর তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে একাধিকবার বদলির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাঁকে মোট চার দফা বদলির চেষ্টা করা হয়েছিল। একপর্যায়ে জেলার একজন ভিআইপির টেলিফোনের পর মাহমুদা বেগমকে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বলেও ওই সূত্র দাবি করেছে।
একটি এলএ কেসে প্রস্তাবিত জমি থেকে প্রায় সাড়ে ৪ একর বাদ পড়া এবং সরকারের সম্ভাব্য ১১০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় কমে যাওয়ার তথ্য সামনে আসার পর তাঁর বদলি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নরসিংদী অংশে এ ধরনের আরও সাতটি এলএ কেস রয়েছে। ফলে পুরো প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া, জমির প্রয়োজনীয়তা ও ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ নিয়ে আরও যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
