রাজশাহীতে এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর ফ্ল্যাটে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক সাবেক শিক্ষার্থীকে আটকে মারধর করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। শনিবার নগরীর আলুপট্টি এলাকার স্বচ্ছ টাওয়ারের একটি ফ্ল্যাটে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ওই রাতেই বোয়ালিয়া থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী। পরে অভিযান চালিয়ে এক নারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন নগরীর শেখপাড়া এলাকার মোহাম্মদ তৌকির জাহান স্মরণ (২৯), ভাটাপাড়া এলাকার আবু রায়হান (২৪), শাহরিয়ার মনন (২৯) এবং বহরমপুর এলাকার জুনাইরা ইসলাম (২২)। তাঁদের মধ্যে আবু রায়হানের বাবা জাহাঙ্গীর আলম রাজপাড়া থানা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ভুক্তভোগী ২৮ বছর বয়সী ওই যুবক পুঠিয়া উপজেলার কান্দ্রা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি রাজশাহী শহরের একটি ছাত্রাবাসে থেকে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
শনিবার সকালে ব্যক্তিগত কাজে রাজশাহী শহরে আসেন তিনি। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে স্বচ্ছ টাওয়ারের পশ্চিম পাশে একটি বিসিএস কোচিং সেন্টার থেকে বের হয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর ধাক্কা লাগে। এ নিয়ে সেখানে থাকা তিনজন তাঁর সঙ্গে কথা কাটাকাটি ও গালিগালাজ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে এক তরুণী সেখানে এসে বিষয়টি সমাধানের কথা বলে ওই তিনজনের সঙ্গে তাঁকে স্বচ্ছ টাওয়ারের ১৫ তলায় নিয়ে যান। ১৫/এ নম্বর ফ্ল্যাটে ঢোকার পর তাঁর মুখ গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর তিন ব্যক্তি তাঁকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। এতে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়।
এজাহারে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে দুটি শর্ত দেওয়া হয়। হয় তাঁদের সঙ্গে থাকা নারীকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হবে, নয়তো এক লাখ টাকা দিতে হবে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে আবার মারধর করা হয়।
এ সময় ওই নারীকে পাশে বসিয়ে তাঁর ভিডিও ধারণ করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। পরে তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মুক্তিপণের পরিমাণ কমিয়ে ৪০ হাজার টাকা করা হয়।
এরপর তাঁর মোবাইল ফোন থেকে বড় বোনের কাছে ফোন করে টাকা চাওয়া হয়। তাঁকে উদ্ধারের জন্য তাঁর বোনের স্বামী কৃষি ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে শাহরিয়ার মননের পূবালী ব্যাংকের রাজশাহী শাখার অ্যাকাউন্টে ৩০ হাজার ১০ টাকা পাঠান। এ ছাড়া ভুক্তভোগীর কাছে থাকা ১০ হাজার টাকাও নিয়ে নেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুক্তিপণের ৪০ হাজার টাকা ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে দেওয়া হয়েছে—এমন কথা লিখিয়ে ভুক্তভোগীর স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে টাকা পাঠানোর স্ক্রিনশট নিয়ে অর্থ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে তাঁকে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, যে ফ্ল্যাটে ভুক্তভোগীকে আটকে রাখা হয়েছিল, সেটির মালিক রাজশাহীর হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী খন্দকার হাসান কবির। গ্রেপ্তার স্মরণের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, সেই সম্পর্কের সূত্রে স্মরণ হোটেলের ম্যানেজারের কাছ থেকে ফ্ল্যাটের চাবি নিয়ে সেখানে প্রবেশ করেন।
তবে ফ্ল্যাটের মালিক খন্দকার হাসান কবির এই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, আসামিরা একটি ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকেছিলেন। তিনি জানান, ফ্ল্যাটটি তাঁর মালিকানাধীন এবং সেখানে তিনি ও তাঁর বড় ছেলে মাঝেমধ্যে থাকেন।
গ্রেপ্তার আবু রায়হানের বাবা জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেছেন, তাঁর ছেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তাঁর ভাষ্য, বন্ধুরা বিপদে পড়ায় তাঁদের উদ্ধার করতে সেখানে গিয়েছিলেন আবু রায়হান।
তাঁর ছেলে ‘ফাঁদে ফেলার’ ঘটনায় জড়িত—পুলিশের এমন বক্তব্যের বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তাঁর ছেলে বেশি কথা বলেছে, এ কারণে পুলিশ এমনটি বলতে পারে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বোয়ালিয়া থানার উপপরিদর্শক আমিনুল ইসলাম বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত চারজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
রোববার গ্রেপ্তার চারজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
