সংসদ সদস্যদের সংসদের বাইরে নৈতিক আচরণ, স্বার্থের সংঘাত ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণে আলাদা আইন বা আচরণবিধি নেই বাংলাদেশে। বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্যদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্কের পর এ ধরনের আইন প্রণয়নের দাবি উঠলেও এখন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের পর বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াতে ইসলামী তাঁকে বহিষ্কার করে। পরে ২০ সেপ্টেম্বর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম নামের এক নারীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় গাজী নজরুলকে আসামি করা হয়েছে এবং তিনি পুলিশের রিমান্ডে রয়েছেন।
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে সংসদের ভেতরে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও আচরণের বিষয়গুলো উল্লেখ আছে। তবে সংসদের বাইরে তাঁদের নৈতিক আচরণ, স্বার্থের সংঘাত ও দায়দায়িত্ব নিয়ে আলাদা কোনো আইন বা আচরণবিধি নেই।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এ কারণে কোনো সংসদ সদস্যের সংসদের বাইরের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে জবাবদিহির বিষয়টি জটিল হয়ে পড়ে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গত মঙ্গলবার জনপ্রতিনিধিদের জন্য বিশেষায়িত ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে।
সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি নিয়ে অতীতে দুটি বেসরকারি বিল আনা হয়েছিল। ২০১০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী নবম সংসদে ‘সংসদ সদস্য আচরণ বিল’ আনেন। ২০১১ সালের মার্চে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি বিলটি পাসের সুপারিশ করলেও নবম সংসদের মেয়াদে তা আইনে পরিণত হয়নি।
এর আগে ২০০৩ সালে বিএনপির সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান ‘দ্য মেম্বার অব পার্লামেন্ট (কোড অব কনডাক্ট) বিল-২০০৩’ শিরোনামে একটি বেসরকারি বিলের নোটিশ দিয়েছিলেন। বিলটি পরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পাঠানো হলেও পরে এর আর কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি।
২০১২ সালে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলেও সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি প্রণয়নের লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে তা বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও ‘সংসদ সদস্য আচরণ’ আইন করার সুপারিশ করেছিল। জুলাই জাতীয় সনদেও সংসদের কমিটি ও সদস্যদের বিশেষ অধিকার, অধিকারের সীমা এবং দায় নির্ধারণে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব রয়েছে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি নিয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট আলোচনা হয়নি। তবে সবাই চাইলে এ ধরনের আচরণবিধি করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, ভুটান ও শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের অনেক দেশে সংসদ সদস্যদের জন্য আচরণবিধি রয়েছে।
অতীতে বাংলাদেশে প্রস্তাবিত বিলগুলোতে সংসদ সদস্যদের নৈতিক অবস্থান, দায়িত্ব, স্বার্থগত দ্বন্দ্ব ও আর্থিক তথ্য প্রকাশ এবং সংসদীয় ‘নৈতিকতা কমিটি’ গঠনের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০১২ সালে টিআইবি ‘নবম জাতীয় সংসদের সদস্যদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক ভূমিকা পর্যালোচনা’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১৪৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৪৪ জনের বিরুদ্ধে এক বা একাধিক নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রশাসনিক কাজে প্রভাব বিস্তার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন বরাদ্দের অপব্যবহার, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার ও নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের মতো অভিযোগ ছিল। ওই প্রতিবেদনে সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি আইন করার সুপারিশ করা হয়।
সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদও বাংলাদেশে সংসদ সদস্যদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
