ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) চালু করা ওয়েবসাইট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। শিক্ষকদের বেশির ভাগই মনে করছেন, শিক্ষক মূল্যায়নের উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নেওয়া উচিত ছিল, ডাকসুর নয়। একই সঙ্গে মূল্যায়নের নম্বর প্রকাশ্যে আসায় শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
ডাকসু গত ১০ সেপ্টেম্বর ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ নামে ওয়েবসাইটটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করে। গতকাল রোববার বিকেল চারটা পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৮৯ জন শিক্ষার্থী শিক্ষকদের মূল্যায়ন করেছেন। ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের প্রাপ্ত নম্বর প্রকাশের সুযোগ থাকায় কিছু শিক্ষকের রেটিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েকজন শিক্ষক ট্রলের শিকার হন। পরে সমালোচনার মুখে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রেটিং দেখার সুযোগ বন্ধ করে দেয় ডাকসু।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসংখ্যা গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ ছিল ৪৭টি, বর্তমানে তা বেড়ে ৮৪ হয়েছে। নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে ২২ হাজার থেকে বেড়ে ৩৭ হাজারের বেশি হয়েছে। একই সময়ে শিক্ষকসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ২ হাজার ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতীতে কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে গবেষণায় অনাগ্রহ, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অদক্ষতা, শিক্ষার্থীদের নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাত এবং হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগও সীমিত ছিল। এসব কারণে শিক্ষক মূল্যায়নের দাবি ছিল।
২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনের আগে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ইশতেহারেও শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ডাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার চার দিন আগে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়।
‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ ওয়েবসাইটে কোর্সের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারি এবং সার্বিক সন্তুষ্টির মতো বিষয় রাখা হয়েছে। শিক্ষক কতটা স্পষ্টভাবে পড়ান, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন ও আলোচনায় উৎসাহিত করেন কি না, সম্মানজনক আচরণ করেন কি না এবং নিয়মিত ও সময়মতো ক্লাস নেন কি না—এসব বিষয়েও মতামত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী ব্যাচগুলোর শিক্ষার্থীরা ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারছেন। এর জন্য একাডেমিক ই-মেইল দিয়ে নিবন্ধন করতে হয় এবং শিক্ষার্থীরা শুধু নিজ বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারেন। ডাকসুর সদস্যদের দাবি, মূল্যায়নকারীর পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছে।
ডাকসু জানিয়েছে, তিন মাসের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তা প্রশাসনের কাছে দেওয়া হবে। তবে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেছেন, ওয়েবসাইটের মূল্যায়ন এখনো চূড়ান্ত নয়; এটি উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করলে ডাকসু তাদের উদ্যোগ বন্ধ করবে বলেও তিনি জানান।
ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রেটিং প্রকাশের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। লোক প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামির একটি রেটিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তাঁর রেটিং পরিবর্তিত দেখিয়ে আরেকটি ফটোকার্ডও ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় তিনি শিক্ষক মূল্যায়নের পদ্ধতি ও প্রতিনিধিত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
বিকেল চারটা পর্যন্ত পাঁচটির বেশি মূল্যায়ন পাওয়া ৮১৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৩৪৭ জনের রেটিং ছিল ৪ থেকে ৫-এর মধ্যে। ২০৫ জনের রেটিং ৩ থেকে ৪, ১৫৫ জনের ২ থেকে ৩ এবং ১০৯ জনের রেটিং ছিল ২-এর নিচে।
শিক্ষকদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছেন, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন কতটা নিরপেক্ষ ও প্রতিনিধিত্বশীল হবে। তাঁদের মতে, সব শিক্ষার্থী সব শিক্ষকের কোর্স করেন না। আবার কোনো শিক্ষার্থী যদি কোনো শিক্ষকের ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত না থাকেন, তাঁর দেওয়া মূল্যায়ন কতটা যুক্তিযুক্ত—সেটিও বিবেচনার বিষয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনও ডাকসুর উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মূল্যায়নের পক্ষে থাকলেও এই কাজ ডাকসুর এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। তিনি জানান, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন।
অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদীর ভাষ্য, ডাকসুর উদ্যোগ শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে এবং অনেক শিক্ষক প্রশাসনের কাছে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ওয়েবসাইটের মাধ্যমে শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের উদ্যোগ আগে থেকেই ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) উদ্যোগে শিক্ষক মূল্যায়নের জরিপ ফরম তৈরি করা হয়েছিল এবং শিক্ষার্থীদের এতে অংশগ্রহণের নির্দেশনাও ছিল। ২০২২ সালে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতির নীতিমালা করা হয়। পরে ২০২৪ সালে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে শিক্ষকদের মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরুতে অন্তত ১৪টি বিভাগে শিক্ষক মূল্যায়ন চালু হয়েছিল। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ৮৪টি বিভাগে একযোগে ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের শিক্ষক মূল্যায়নে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে কোনো শিক্ষক কত নম্বর পেয়েছেন, তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন শিক্ষক পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়গুলোর একটি। সেখানে মূল্যায়নের আয়োজন ছাত্রসংসদ করে না এবং ফলাফল প্রকাশ্যে আসে না। মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়াতেও কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ফরম পূরণ করতে হয়; তবে প্রাপ্ত নম্বর গোপন রাখা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দল ও মতের অনুসারী ১০ জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাঁদের বেশির ভাগই ডাকসুর উদ্যোগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, এই ব্যবস্থা শিক্ষকদের অসম্মান করার সুযোগ তৈরি করেছে।
শিক্ষক ও গবেষক আসিফ বিন আলী এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষক মূল্যায়ন প্রয়োজন হলেও তা একাডেমিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রেখে করা উচিত।
অন্যদিকে ডাকসুর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের চাহিদার ভিত্তিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া জানিয়েছেন, ওয়েবসাইট চালুর জন্য তিনি এক বছর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে সহায়তা চেয়েছেন, কিন্তু পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি।
ফলে শিক্ষক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মোটামুটি ঐকমত্য থাকলেও কে এই মূল্যায়ন করবে, কী পদ্ধতিতে করবে এবং মূল্যায়নের ফল কতটা গোপন রাখা হবে—এসব বিষয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
