১৯৮০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া প্রথম ভাষণে বাংলাদেশের স্বনির্ভর উন্নয়নের সংগ্রাম, দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। একই সঙ্গে তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
ভাষণে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনসংখ্যার চাপ, বেকারত্ব, ভূমিহীনতা ও নিম্ন মাথাপিছু আয়সহ বিভিন্ন উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে আরও স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব জাপান ও নেদারল্যান্ডসের তুলনায় দ্বিগুণ এবং দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ বেকার অথবা ভূমিহীন কৃষক। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ২০ লাখ মানুষের খাদ্যসংস্থানের প্রয়োজন হয় বলেও তিনি জানান।
এত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানান জিয়াউর রহমান। প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করা, ১৯৮৫ সালের মধ্যে জন্মহার কমিয়ে আনা এবং বিদ্যালয় ও হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেন। পাশাপাশি কোনো নারী, পুরুষ বা শিশু যেন খাদ্য, আশ্রয় ও পোশাক থেকে বঞ্চিত না হয়, সে লক্ষ্যেও প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে দেশের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দেশের প্রায় ৯ কোটি মানুষকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি অঙ্গীকার এবং স্বনির্ভরতাকে দেশের মূলমন্ত্র হিসেবে তুলে ধরেন।
ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন জিয়াউর রহমান। আঞ্চলিক শান্তির সঙ্গে জাতীয় উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি এ অঞ্চলে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর একটি শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তাব দিয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে উঠলেও দক্ষিণ এশিয়ায় কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ তখনও সীমিত ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক কল্যাণে সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, আঞ্চলিক সহযোগিতা উত্তেজনা কমাতে এবং অভিন্ন স্বার্থে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর অবস্থান নমনীয় করতেও সহায়তা করতে পারে।
জিয়াউর রহমান উন্নত দেশগুলো ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টিও জাতিসংঘে তুলে ধরেন। বিশ্বের একটি বড় অংশ দারিদ্র্য ও বঞ্চনার মধ্যে থাকলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে তিনি মত দেন।
তিনি ব্রান্ডট কমিশনের সুপারিশের প্রতি সমর্থন জানান। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহায়তা, সম্পদ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ন্যায্য বাণিজ্য বাড়ানোর মাধ্যমে নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য উন্নত দেশগুলোর সহায়তা দ্বিগুণ করা এবং তা শর্তহীন অনুদান হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি। পাশাপাশি স্বল্পমূল্যে তেল সরবরাহ এবং এসব দেশের জ্বালানি সম্পদ উন্নয়নে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ার কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে সহায়তার ক্ষেত্রে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর আরও দায়িত্বশীল ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। এর মাধ্যমে তিনি জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, তারেক রহমানের ভাষণে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গা ইস্যু উঠে আসতে পারে।
জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। এরপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারেক রহমানের আসন্ন ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সঙ্গে জিয়া পরিবারের চার দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্কের আরেকটি অধ্যায় যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে দেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
