নিজের একটি ফ্ল্যাট থাকা অনেকেরই দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। তবে বসবাসের জন্য ফ্ল্যাট কেনা এবং বিনিয়োগ হিসেবে ফ্ল্যাট কেনা—দুটি বিষয় এক নয়। বিশেষ করে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিকল্প বিনিয়োগ থেকে সম্ভাব্য আয়, ঋণের খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং মূলধন আটকে যাওয়ার বিষয়গুলোও বিবেচনা করা প্রয়োজন।ফ্ল্যাট কেনার বাস্তবতা
ঢাকার বছিলায় চাকরিজীবী এ কে এম আজহার একটি ফ্ল্যাটের বুকিং দিয়েছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী আজহার ফ্ল্যাট কেনার জন্য একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে পাঁচ বছরের মেয়াদে ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন।
নিজের ফ্ল্যাটে এখনো উঠতে না পারলেও প্রতি মাসে তাকে ৪৫ হাজার ২৫০ টাকা ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি বর্তমান বাসার ভাড়া ও সংসারের অন্যান্য খরচও বহন করতে হচ্ছে। ঋণের মেয়াদ কম হওয়ায় মাসিক কিস্তির পরিমাণও বেশি হয়েছে।
ধরা যাক, ঢাকায় আপনি মাসে ৪০ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে থাকেন। কোনো ঋণ নেই এবং দীর্ঘদিনের সঞ্চয় হিসেবে আপনার হাতে রয়েছে ৫০ লাখ টাকা। এই অর্থ দিয়ে ফ্ল্যাট কেনার উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে প্রয়োজন হলে বাকি অর্থ ব্যাংকঋণ থেকে নিতে হবে।
ফ্ল্যাট কিনলে ভাড়া দিতে হবে না—শুধু এই হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কারণ ফ্ল্যাট কেনার পেছনে যে অর্থ ব্যয় হবে, সেটি অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগ করলে সম্ভাব্য কত আয় হতে পারত, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি ঋণের সুদ, কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, কর ও অন্যান্য খরচও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
অন্য একটি উদাহরণে ধরা হয়েছে, ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট কিনতে ১ কোটি টাকা প্রয়োজন। একই ধরনের ফ্ল্যাটে গ্যারেজসহ মাসিক ভাড়া ৪০ হাজার টাকা হলে বছরে ভাড়া বাবদ খরচ হয় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে ১ কোটি টাকা কোনো খাতে বিনিয়োগ করে গড়ে ৮ শতাংশ রিটার্ন পাওয়া গেলে বছরে প্রায় ৮ লাখ টাকা আয় হতে পারে, অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রায় ৬৬ হাজার ৬৬৭ টাকা। তবে প্রকৃত রিটার্ন ৮ শতাংশের কম বা বেশি হতে পারে।
ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সম্পত্তির দাম কতটা বাড়তে পারে, সেটিও বিবেচনায় রাখা দরকার। দীর্ঘ মেয়াদে দাম বাড়লে মালিকের সম্পদের মূল্য বাড়তে পারে। তবে এর নিশ্চয়তা নেই।
ফ্ল্যাটের মূল্য ভবিষ্যতে কী হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে অবস্থান, ভবনের বয়স, নির্মাণমান, যোগাযোগব্যবস্থা, নগর উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার ওপর।
অন্যদিকে ভাড়া বাসায় থাকলে নিজের মূলধন তুলনামূলকভাবে ব্যবহারযোগ্য থাকে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগের ধরন পরিবর্তন করা যায়। তবে সময়ের সঙ্গে টাকার মূল্য কমে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে আবার বড় অঙ্কের অর্থ একটি সম্পদে আটকে যায়। জরুরি প্রয়োজনে সেই সম্পদ দ্রুত নগদে রূপান্তর করাও সহজ নয়।
ধরা যাক, আপনার হাতে ৫০ লাখ টাকা আছে এবং আরও ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ১ কোটি টাকার ফ্ল্যাট কিনছেন। তখন নিজের ৫০ লাখ টাকা ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ করার পাশাপাশি প্রতি মাসে ঋণের কিস্তি দিতে হবে।
ঋণের সুদ ফ্ল্যাটের প্রকৃত খরচ বাড়িয়ে দেয়। তাই ফ্ল্যাটের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ঋণের মোট সুদের পরিমাণও তুলনা করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া নিবন্ধন, কর, ফি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও মোট বিনিয়োগ ব্যয়ের অংশ। মালিকানার সময় রক্ষণাবেক্ষণ খরচও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
নিজের বাড়িতে থাকার নিরাপত্তা, নিজের পছন্দ অনুযায়ী পরিবেশ তৈরি করার স্বাধীনতা, বাড়িওয়ালার সঙ্গে সম্পর্কজনিত ঝামেলা না থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি স্থায়ী ঠিকানা—এসব বিষয়ও অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
অবসরজীবনে নিজের বাসা থাকাকে কেউ কেউ আর্থিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও দেখেন। ফলে ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত শুধু সম্ভাব্য আর্থিক রিটার্ন দিয়ে বিচার করা যায় না।
নিজের থাকার জন্য ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে শুধু ‘ভাড়া দেব, নাকি কিস্তি দেব’—এভাবে তুলনা করা যথেষ্ট নয়। বরং বিবেচনায় রাখতে হবে ফ্ল্যাট থেকে সম্ভাব্য লাভ, বিকল্প বিনিয়োগ থেকে সম্ভাব্য আয়, ঋণের খরচ এবং মূলধন আটকে গেলে সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, ফ্ল্যাট কেনার পরও হাতে পর্যাপ্ত জরুরি সঞ্চয় থাকবে কি না। পুরো সঞ্চয় ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ করে ঋণ নিলে পরিবারের আর্থিক ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ফ্ল্যাট শেষ পর্যন্ত শুধু বিনিয়োগ নয়, একটি সম্পদও। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আর্থিক রিটার্নের পাশাপাশি নিজের আয়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
