চূড়ান্ত পরীক্ষার শেষ ধাপে রূপপুর, ডিসেম্বরে বাণিজ্যিক উৎপাদন অনিশ্চিত
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে চূড়ান্ত ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী মাসে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি চলছে। তবে সব পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পরই বিদ্যুৎ উৎপাদনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পরিকল্পনা থাকলেও তা নির্ধারিত সময়ে সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
পাবনার রূপপুরে নির্মিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির পর্যায়ে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে গত ১২ মে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত বিভাজন বিক্রিয়া শুরু হবে। সেই বিক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ দিয়ে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ধাপে ২ হাজার ৪৬টি এবং দ্বিতীয় ধাপে ৯০টি পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপের শেষ পর্যায়ে আরও ১৮টি জটিল পরীক্ষা বাকি রয়েছে। প্রতিটি ধাপের ফলাফল যাচাই করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিচ্ছে।
পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়ও বিভিন্ন নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাই অব্যাহত থাকবে। এই পরীক্ষামূলক উৎপাদন টানা সাত থেকে আট মাস চলতে পারে। সব প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হলে আগামী বছর প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহের আশা করা হচ্ছে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান বলেন,
“পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ধাপ সংবেদনশীল, জটিল ও নিরাপত্তানির্ভর। প্রতিটি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তার ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়। প্রয়োজন হলে সংশোধন করে পরবর্তী ধাপে এগোনো হয়। তাই আগে থেকে নির্দিষ্ট করে উৎপাদনের সময় বলা কঠিন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার সব তথ্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়। তারা পর্যালোচনা করছে। তাদের অনুমোদন পেলে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।”
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে এনপিসিবিএল। রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট পাবনায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কেন্দ্রটি থেকে ২৪ ঘণ্টা সমান হারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। প্রতি দেড় বছর পর নতুন পারমাণবিক জ্বালানি প্রতিস্থাপন করতে হবে। জ্বালানি পরিবর্তন, ব্যবহৃত জ্বালানি অপসারণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি ইউনিট সর্বোচ্চ দুই মাস বন্ধ থাকতে পারে।
ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানিতে তেজস্ক্রিয়তা থাকায় তা বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রাশিয়ায় পাঠানো হবে। সেখানে প্রক্রিয়াজাত করার পর ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় পদার্থ মাটির প্রায় ৪০০ মিটার নিচে সংরক্ষণ করা হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট মস্কোতে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
তবে বর্জ্য পরিবহনের বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ব্যবহৃত জ্বালানি অপসারণের পর তা তাৎক্ষণিকভাবে পাঠানো সম্ভব নয়। নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতল করার প্রয়োজন হয় এবং প্রয়োজনে ১০ বছর পর্যন্ত রূপপুরেই রাখা যাবে। পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য আর্থিক বিষয় বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান টিভিএল রূপপুর প্রকল্পে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ করবে। প্রথম তিন বছরের জ্বালানি নির্মাণ চুক্তির আওতায় এসেছে। পরবর্তী সময়েও কেন্দ্রের পুরো মেয়াদে জ্বালানি সরবরাহের বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে। তবে বাংলাদেশ চাইলে চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ থাকবে।
চুক্তিতে জ্বালানির নির্দিষ্ট মূল্য উল্লেখ নেই। যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক পারমাণবিক জ্বালানি মূল্যসূচক অনুসারে দাম নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সর্বোচ্চ মূল্যসীমাও নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে।
২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রোসাটমের প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের মধ্যে মূল নির্মাণ চুক্তি হয়।
মূল প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে তা দুই বছর বাড়ানো হয় এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে আরও ছয় মাস বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। যদিও ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ ছিল না। কিন্তু ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
কর্মকর্তাদের মতে, করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের জটিলতা, যন্ত্রপাতি আমদানি, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের যাতায়াত এবং ডলার সংকটের কারণে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে যায়।
রূপপুরে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য এখনো চূড়ান্ত হয়নি। পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর পর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণ করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয়বহুল হলেও জ্বালানির খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় অন্যান্য উৎসের বিদ্যুতের তুলনায় এর দাম বেশি হবে না।
রূপপুর কেন্দ্রকে নিরাপদে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে ২০১৬ সালে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় একটি সমন্বিত গ্রিড সমীক্ষা পরিচালনা করে পাওয়ার গ্রিড পিএলসি।
পাওয়ার গ্রিডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান বলেন,
“পারমাণবিক বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা নিয়ে গ্রিড পুরোপুরি তৈরি আছে।”
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্পিনিং রিজার্ভ বা বিকল্প তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গ্যাসসংকটের কারণে প্রয়োজনীয় রিজার্ভ নিশ্চিত করা কঠিন হচ্ছে। যদিও পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে রূপপুর থেকে অল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে, তাই স্পিনিং রিজার্ভ বড় সমস্যা হবে না।
জাতীয় গ্রিডে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় রাষ্ট্রীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রীরা ভার্চুয়ালি বা সরাসরি যুক্ত হতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন,
**“সরকারের পক্ষ থেকে উৎপাদনের সময় নির্দিষ্ট করে আগাম বলার সুযোগ নেই। এখন প্রতিটি মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরি। তারা যখন সক্ষমতার বিষয়ে নিশ্চয়তা দেবে, তখন থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। কোনো একটা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে আবার এটি পিছিয়ে যেতে পারে। এখন সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও জটিল সময়। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ত্রুটিবিচ্যুতি নিবিড়ভাবে যাচাই করতে হবে। দেরি যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন তাড়াহুড়া করার সুযোগ নেই। এতে ভুল হতে পারে।”
