ভারতের মধ্যপ্রদেশের সিংগ্রৌলির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখ নিধি তিওয়ারির মৃত্যু ঘিরে তদন্ত করছে পুলিশ। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম মিলিয়ে প্রায় ১৬ লাখ অনুসারী ছিল ৩০ বছর বয়সী এই তরুণীর। নিয়মিত নাচের ভিডিও প্রকাশের পাশাপাশি স্থানীয় অনুষ্ঠান ও সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন তিনি। ২০২৪ সালে ‘মিস প্রিটি ইন্ডিয়া’ খেতাবও জিতেছিলেন নিধি। স্বপ্ন ছিল চলচ্চিত্রে কাজ করার।
সিংগ্রৌলির ভুসা মোড় এলাকার বাড়িতে নিধিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মৃত্যুর আগে কয়েক ঘণ্টায় কী ঘটেছিল, তা জানতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। বিশেষ করে এক বিবাহিত প্রকৌশলীর সঙ্গে তাঁর শেষ ফোনালাপ, পরিবারের অভিযোগ এবং মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিধি সিংগ্রৌলির মরওয়া এলাকার জিএস গ্র্যান্ড হোটেলে রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। সেখানে কাজের সূত্রে পরিচয় হয় সোনু সিং নামের এক প্রকৌশলীর সঙ্গে বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার। ওই ব্যক্তি এনসিএল-সংশ্লিষ্ট একটি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন।
নিধির মা হেমলতা তিওয়ারি পুলিশকে জানিয়েছেন, হোটেলে কাজ করার সময় তাঁদের পরিচয় হয় এবং পরে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে পরিবার জানতে পারে, ওই প্রকৌশলী বিবাহিত এবং তাঁর দুই সন্তান রয়েছে। এরপর নিধিকে তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য বলা হয়েছিল।
তবে মায়ের অভিযোগ, এরপরও তাঁদের যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। ওই প্রকৌশলী নিধির ওপর নজর রাখতেন এবং তিনি কোথায় বা কার সঙ্গে আছেন, তা জানতে চাইতেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরিবারের এসব অভিযোগ এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি। প্রকৌশলীর ভূমিকা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
নিধির মৃত্যুর আগের রাতের ঘটনাগুলো তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিবারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যায় নিচতলায় পূজা করার পর নিজের ঘরে চলে যান নিধি। তখন তাঁর কানে ব্লুটুথ ইয়ারফোন ছিল।
রাত প্রায় ৮টার দিকে ওই প্রকৌশলীর সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয় বলে জানিয়েছে পরিবার। তাঁদের মধ্যে ওই সময় বাগ্বিতণ্ডা হয়েছিল বলে নিধির মায়ের বক্তব্য। তবে ফোনালাপে ঠিক কী কথা হয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। কলের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
ফোনালাপের পর নিধি নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। কিছুক্ষণ পর পরিবারের সদস্যরা তাঁর ঘরের কাছে গেলেও তিনি দরজা খোলেননি।
রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে পরিবারের সদস্যরা নিধির দরজায় ধাক্কা দেন। কিন্তু তিনি দরজা খোলেননি এবং তাঁদের চলে যেতে বলেন। খাবারও নিতে চাননি বলে জানিয়েছে পরিবার। এরপর পরিবারের সদস্যরা তাঁকে একা থাকতে দেন।
পরদিন সকালেও দরজা বন্ধ থাকায় পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হয়। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। পুলিশ এসে জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে নিধিকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায়। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
নিধির মৃত্যুর পর ওই প্রকৌশলীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়টি তদন্তের কেন্দ্রে এসেছে। পরিবারের অভিযোগ, তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিল এবং পরিবারের আপত্তির পরও তা বন্ধ হয়নি।
নিধির মৃত্যুর পর ওই ব্যক্তির মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে এবং পুলিশ তাঁকে খুঁজছে। তাঁর সঙ্গে নিধির সম্পর্ক এবং মৃত্যুর আগে তাঁদের কথোপকথন তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তবে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। নিধির মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও তদন্তাধীন।
মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন নিধি। সেখানে নিজের ভেতরের শূন্যতা ও নিজেকে ভালোবাসার কথা লিখেছিলেন। পোস্টে তিনি নিজের অসম্পূর্ণতাকে নিজেই পূর্ণ করে নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
পোস্টটিও তদন্তের অংশ হিসেবে দেখছে পুলিশ। তবে এর সঙ্গে নিধির মৃত্যুর সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
পরিবারের বড় মেয়ে ছিলেন নিধি। তাঁর মা জানিয়েছেন, পরিবারের দায়িত্বও অনেকটাই সামলাতেন তিনি। সিংগ্রৌলির বাইধান এলাকায় একটি বড় বাড়ি নির্মাণের কাজও করছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছিলেন নিধি। ফেসবুকে তাঁর প্রায় ৯ লাখ ২৮ হাজার এবং ইনস্টাগ্রামে প্রায় ৭ লাখ ১২ হাজার অনুসারী ছিল। স্থানীয় অনুষ্ঠান ও সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ২০২৪ সালে ‘মিস প্রিটি ইন্ডিয়া’ খেতাব অর্জন করেন তিনি। অভিনয়ে যাওয়ারও স্বপ্ন ছিল তাঁর।
নিধির মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং শেষ কয়েক ঘণ্টায় কী ঘটেছিল, তা জানতে তাঁর কল রেকর্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করছে পুলিশ।
মৃত্যুর আগে কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, শেষ ফোনালাপে কী কথা হয়েছিল এবং পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে এসব তথ্যের মিল রয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারের করা অভিযোগগুলোও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ বা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিশ্চিত হয়নি। ফলে প্রকৌশলীর সঙ্গে নিধির সম্পর্ক এবং তাঁর মৃত্যুর মধ্যে কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, সে বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
