ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘ককরোচ’ আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ‘পথভ্রষ্ট সন্তান’ আখ্যা দিয়ে ক্ষমা করার কথা বলার পর নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, আন্দোলন দমনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে নীরব থেকে প্রধানমন্ত্রী এখন নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরছেন।
ভারতে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ’ আন্দোলন নিয়ে দেওয়া বক্তব্যে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ক্ষমার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে তাঁর এই মন্তব্যের পর আন্দোলনকারীরা পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
গত শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় মোদি বলেন, আন্দোলনকারীরা ‘পথভ্রষ্ট সন্তান’; তাই তাদের শাস্তি দেওয়া বা আদালতের দ্বারে ঘোরানোর পরিবর্তে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি জানান, আন্দোলনের সময় তাঁকে এবং তাঁর প্রয়াত মাকে উদ্দেশ করে অশালীন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এরা পথভ্রষ্ট সন্তান। তাদের সঠিক পথ দেখানো আমাদের দায়িত্ব। শাস্তি দেওয়া, আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘোরানো বা সমাজে হয়রানি করে পরিস্থিতির পরিবর্তন আনা যাবে না।’ এছাড়া তিনি যোগ করেন, ‘আমাদের মেয়েরা কীভাবে এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারে, তা আমাদের সংস্কৃতির জন্য একটি বড় ধাক্কা।…আমি তাদের ক্ষমা করে দিতে চাই।’
গত মে মাসে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল করা হয়। এতে ২০ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীকে পরের মাসে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হয় ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর আন্দোলন, যা পরে দেশজুড়ে বিক্ষোভে রূপ নেয়।
আন্দোলনের সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণ ও আন্দোলনকারীদের ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করলে বিক্ষোভকারীরা সেটিকেই নিজেদের পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘ককরোচ’ পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ, মিম ও বিদ্রূপের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দাবি তুলে ধরেন তারা। পরে নয়াদিল্লিসহ বিভিন্ন শহরে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
আন্দোলনের মুখে সরকার শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নিশ্চিত করে এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। তাদের দাবি, বিজেপিশাসিত কয়েকটি রাজ্যে শত শত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোর, আবার কারও বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে আপত্তিকর স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী মোদির সমর্থকদের বিরুদ্ধে নারী আন্দোলনকারীদের, এমনকি কিশোরীদের ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ, ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাধিকা কুমার আল–জাজিরাকে বলেন, ‘রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো দমন–পীড়ন নিয়ে মোদি নীরব। অথচ ইনস্টাগ্রামে এসে নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরছেন। বছরের পর বছর এই সরকারের সমর্থকেরা অনলাইনে নারীদের গালিগালাজ করেছে, ভয় দেখিয়েছে। এখন প্রধানমন্ত্রী নৈতিকতার দোহাই দিয়ে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন।’
গত ২৭ জুলাই আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বিভিন্ন রাজ্যে শত শত শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগে বিরোধী দলগুলো দিল্লির আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে।
এদিকে আন্দোলনের পর সরকার সরকারি পরীক্ষাব্যবস্থা-সংক্রান্ত আইন সংশোধনের একটি বিল সংসদে উত্থাপন করেছে। এতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের জন্য আরও কঠোর শাস্তি ও বেশি অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, হায়দরাবাদে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার (মেটা ইন্ডিয়া) প্রধান অরুণ শ্রীনিবাসের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের অভিযোগে মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। মেটার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সহযোগিতা করছে।
এ ছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আদালত বা সরকারের নির্দেশে চিহ্নিত বেআইনি অনলাইন কনটেন্ট তিন ঘণ্টার মধ্যে অপসারণের নতুন বিধান কার্যকর হয়েছে। এর আগে এই সময়সীমা ছিল ৩৬ ঘণ্টা।
