গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে। আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে চুক্তিটি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। এতে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের দীর্ঘমেয়াদি অধিকার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি রাশিয়া ও চীনের সামরিক উপস্থিতি এবং সংবেদনশীল খাতে বিনিয়োগ সীমিত করার ব্যবস্থা থাকবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে গ্রিনল্যান্ডের প্রতি আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন। দ্বীপটি কেনার চেষ্টা সফল না হলেও কূটনৈতিক চাপ ও বাণিজ্য শুল্কের হুমকির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি চুক্তির দিকে এগিয়েছে, যা গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তায় মার্কিন ভূমিকা স্থায়ী করবে বলে দাবি করা হচ্ছে।
ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে জানিয়েছেন, চুক্তির ফলে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার স্থায়ী অধিকার থাকবে। একই সঙ্গে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সামরিক উপস্থিতি বা সংবেদনশীল বিনিয়োগ ঠেকানোর সুযোগ তৈরি হবে। চুক্তি কার্যকর হলে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো, বিমান পরিচালনা এবং ঘাঁটি ব্যবহারের অধিকারও পাওয়া যাবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন হলেও চুক্তিটি কার্যকর থাকবে। ট্রাম্পের মতে, কৌশলগত কারণে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন এবং তাঁর প্রশাসন দ্বীপটির নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে।
আরেক মার্কিন কর্মকর্তা এএফপিকে জানিয়েছেন, চুক্তিটির মাধ্যমে চীন ও রাশিয়াকে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন বা সেনা মোতায়েন থেকে বিরত রাখার পাশাপাশি সংবেদনশীল খাতে তাদের বিনিয়োগ ঠেকানোর ব্যবস্থা থাকবে।
উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে গ্রিনল্যান্ড ভৌগোলিক ও সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র চলাচলের অন্যতম সংক্ষিপ্ত পথও এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে যায়।
এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ডে বিরল খনিজসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের বড় মজুদ রয়েছে। এসব খনিজ উন্নত প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ফলে দ্বীপটির ওপর প্রভাব বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ খনিজ বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে ভূগর্ভস্থ বিভিন্ন খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনাও সামনে আসছে। এ কারণে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর কাছে অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
চীন আর্কটিক অঞ্চলের মধ্য দিয়ে নিয়মিত বাণিজ্যিক কনটেইনার শিপিং কার্যক্রম শুরু করায় গ্রিনল্যান্ডে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ঠেকানোর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন চুক্তির মাধ্যমে সংবেদনশীল অবকাঠামোয় চীনা বিনিয়োগ সীমিত হলে দেশটির ‘পোলার সিল্ক রোড’ পরিকল্পনাও বাধার মুখে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন জানিয়েছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব বা আঞ্চলিক অখণ্ডতা ক্ষুণ্ণ হবে না। গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও বহাল থাকবে বলে তারা জানিয়েছেন।
ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, চুক্তিটি ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি করেছে এবং এটি ন্যাটো ও ইউরোপের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে নিলসেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি গ্রিনল্যান্ডের আঞ্চলিক নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করবে।
