পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, কূটনৈতিক সংলাপ এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণের মাধ্যমে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করবে না বাংলাদেশ। এমনটাই জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক) হুমায়ুন কবির।
গত ১৭ আগস্ট রাজধানীর মিন্টু রোডে নিজের সরকারি বাসভবনে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হলেও সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঢাকা আপাতত অপেক্ষার নীতি নিয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় ঐকমত্য ও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান থাকবে বলেও জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর নিয়ে প্রকাশিত খবরকে অনুমাননির্ভর বলে উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির। তাঁর ভাষ্য, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং সরকারপ্রধান পর্যায়ের সফর অনেকাংশে ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতা ভারতকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে হবে। ওই আন্দোলনে দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মতে, বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, সেটি আগে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে তড়িঘড়ি করে কোনো শীর্ষ পর্যায়ের সফরের প্রয়োজন নেই।
তাঁর ভাষায়, নির্দিষ্ট বিষয়ে দুই দেশের ঐকমত্য এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণের ভিত্তিতে অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হলে ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা খুবই কম।
বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক ব্যক্তিদের ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কিংবা গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া ভারতের গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ড পরিচালনা অথবা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি, সন্ত্রাসী কিংবা খুনিদের রাজনৈতিক বা গণমাধ্যমে জায়গা দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দোহাই দিয়েও বিষয়টি বৈধতা দেওয়া যায় না। এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নয়াদিল্লির কাছে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে ঘিরে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার বিষয়েও বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে গ্রীষ্মকাল শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রিয়াদ সফর চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে বলেও জানান হুমায়ুন কবির।
পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ওয়ার্কিং বাইল্যাটারাল রিলেশনশিপ, বাণিজ্য এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদার করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ চলছে বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে সয়াবিন আমদানি এবং বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্যিক পরিমাণ বাড়ানোর প্রচেষ্টাও চলছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ট্রেড অ্যান্ড পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট নিয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনা শুরু হয়েছে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভূরাজনৈতিক চাপ এড়িয়ে ‘টু প্লাস টু’ মেকানিজম ও কম্প্রিহেন্সিভ পার্টনারশিপের আওতায় চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। চীনা সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই আকর্ষণ নিয়েও আলোচনা চলছে।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর বিষয়েও বিশেষ কূটনৈতিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রেসিডেন্সি নির্বাচনে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ৫২টি দেশের বাংলাদেশকে সমর্থনের বিষয়টি তুলে ধরেন হুমায়ুন কবির।
আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও কাজে লাগিয়ে শিগগিরই পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আফ্রিকা সফর করবে বলে জানান তিনি। সফরে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং এবং বাংলাদেশি পণ্যের জন্য নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির লক্ষ্যে একাধিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়েও আশার কথা জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক মনোভাব এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অগ্রগতির ফলে দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। খুব শিগগিরই বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথ আবার খুলে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়াকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং সরকারের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রেসিডেন্সির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে নীতিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমার, চীনসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর আর্থিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়ে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ জোরদার করা হবে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দাবি, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে একটি সুসংহত পররাষ্ট্রনীতি কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাফল্য এবং সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের ভাবমূর্তি ও সার্বভৌম মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার অগ্রগতির প্রমাণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সিলেটের ওসমানীনগরের সন্তান হুমায়ুন কবির যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠেন। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স (এলএসই), কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং লিডস ল’ স্কুল থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
পেশাজীবনে যুক্তরাজ্যের তিন প্রধানমন্ত্রী—বরিস জনসন, লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাকের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন হুমায়ুন কবির।
