সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও সামরিক সমীকরণে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তানের বিদ্যমান বৈরিতার মধ্যে এ চুক্তির প্রভাব এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ভারত-ইসরায়েল সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে কি না—তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
প্রথম আলোর কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের বিশ্লেষণে এসব বিষয় উঠে এসেছে। ২৩ আগস্ট প্রকাশিত তাঁর কলামে তিনি লিখেছেন, মক্কা চুক্তির প্রভাব বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর ওপরও পড়তে পারে।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান সীমান্তসংলগ্ন দেশ নয়। ফলে এ চুক্তিকে প্রচলিত অর্থে আঞ্চলিক জোট বলা যায় না। লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তানির্ভরতার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন তিন দেশকে কাছাকাছি আসতে ভূমিকা রেখেছে।
চুক্তির আওতায় তিন দেশের কোনো একটি আক্রান্ত হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। এই বিধানকে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
পাকিস্তান এরই মধ্যে সৌদি আরবে কিছু আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সেনাসদস্য মোতায়েন করেছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে পৃথক একটি সামরিক চুক্তিও হয়েছিল।
মক্কা চুক্তির পর ভারত-ইসরায়েল সামরিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
লেখকের মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বৈরী সম্পর্কের কারণে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নয়াদিল্লির জন্য নতুন নিরাপত্তা-চিন্তার কারণ হতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতও অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী হতে পারে।
ইসরায়েলের দিক থেকেও ত্রিদেশীয় চুক্তিটি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। তুরস্কের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে ইসরায়েলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগের বিষয়ও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
মক্কা চুক্তির প্রভাব শুধু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—এমন আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে কলামে। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের সামরিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হলে এর প্রভাব বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশেও পড়তে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বড় দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দেওয়া এসব দেশের জন্য কঠিন। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে তৈরি অর্থনৈতিক সংকটও তাদের ওপর চাপ তৈরি করছে।
লেখকের মতে, মক্কা চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে তুরস্ক ও সৌদি আরবকে আরও সরাসরি যুক্ত করার পাশাপাশি ইসরায়েলের সক্রিয়তাও বাড়াতে পারে। এর ফলে অঞ্চলটিতে সামরিক প্রতিযোগিতা ও সম্ভাব্য প্রক্সি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মক্কা চুক্তির পর বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি কৌশলগত প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ এমন কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হবে কি না এবং ভারত-ইসরায়েল সামরিক সহযোগিতা বাড়লে তার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের করণীয় কী হবে—এসব বিষয় নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় আসতে পারে।
এ ছাড়া সৌদি আরব ও তুরস্ক মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে বাংলাদেশের সমর্থন চাইতে পারে বলেও লেখায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ গত কয়েক বছর ধরে স্পষ্ট বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো, আলতাফ পারভেজের কলাম।
