ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের আষাঢ়িয়ার চর সেতু সংস্কারকে কেন্দ্র করে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে নারায়ণগঞ্জের আষাঢ়িয়ার চর থেকে কুমিল্লার চান্দিনা পর্যন্ত প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার এলাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে পড়েন দূরপাল্লার বাসের যাত্রী, পণ্যবাহী ট্রাক, বিদেশগামী যাত্রী ও রোগীবাহী যানবাহনের যাত্রীরা।
দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে হৃদরোগে আক্রান্ত আমিরুন্নেছা নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে তার স্বজন জানিয়েছেন। শুক্রবার রাত ৮টার দিকে লক্ষ্মীপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর রাত ১১টার দিকে দাউদকান্দি এলাকায় যানজটে আটকা পড়ে অ্যাম্বুলেন্সটি। প্রায় চার ঘণ্টা যানজটে স্থবির থাকার পর রাত সাড়ে ৩টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সেই তার মৃত্যু হয়।
নিহত আমিরুন্নেছা লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার প্রাণভগবতীপুর গ্রামের বাসিন্দা। নিহতের স্বজন তারেক আল হাসান জানান, হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হচ্ছিল।
তবে দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রেম দাস রায় বলেন, যানজটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সে রোগী মারা যাওয়ার বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো তথ্য ছিল না। সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে তারা ঘটনা সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আষাঢ়িয়ার চর সেতুর ঢাকা অভিমুখী লেনে বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় শুক্রবার সকাল থেকে সেখানে সংস্কারকাজ শুরু হয়। কাজ চলাকালে একটি লেন বন্ধ রেখে অপর লেন দিয়ে দুই দিকের যানবাহন চলাচল করানো হয়। এতে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে শুক্রবার রাত থেকে যানজট তীব্র আকার ধারণ করে।
শনিবার সকালে যানজট কুমিল্লার চান্দিনা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। চান্দিনা, দাউদকান্দি, গৌরীপুর, মেঘনা ও আশপাশের এলাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কোথাও কোথাও কয়েক ঘণ্টা ধরে যানবাহন প্রায় স্থির অবস্থায় ছিল।
ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক ইসলাম বলেন, মেঘনা থেকে চান্দিনা পর্যন্ত যানজট ছিল। তবে তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে মহাসড়কে পর্যাপ্ত হাইওয়ে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। সংস্কারকাজ শেষ হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তীব্র যানজটে আটকে অনেক বিদেশগামী যাত্রী সময়মতো বিমানবন্দরে পৌঁছাতে পারেননি। দাউদকান্দির কল্যাপুর গ্রামের সৌদি আরবগামী যাত্রী হাছান আলী জানান, শনিবার ভোর ৬টায় তার ফ্লাইট ছিল। তিনি শুক্রবার রাত ৯টায় রওনা হয়ে পরদিন সকাল ৭টায় গন্তব্যে পৌঁছান। দীর্ঘ যানজটের কারণে তার ফ্লাইট মিস হয়েছে।
আরেক যাত্রী জানান, দাউদকান্দি থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় গাড়িতে ওঠার পর রাত ২টা ২০ মিনিটেও তিনি মেঘনা সেতু এলাকায় আটকে ছিলেন। মাত্র ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সাত ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে বলে তিনি জানান।
দীর্ঘ যানজটে আটকে প্রচণ্ড গরমে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেক যাত্রী খাবার ও পানির সংকটেও পড়েন বলে অভিযোগ করেছেন।
মালবাহী লরিচালক জাকির হোসেন বলেন, কুমিল্লার আলেখারচর এলাকায় প্রায় ১৫ দিন ধরে যানজটে ভোগার পর আবার মহাসড়কের অন্য অংশে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দিনের পর দিন যানজটে আটকে চালকদের সময়, জ্বালানি ও অর্থের অপচয় হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জেদ্দা এক্সপ্রেসের চালক আ. হামিদ জানান, ভোর ৫টায় মাখাইয়া এলাকায় যানজটে আটকে সকাল ১০টা পর্যন্ত গৌরীপুরে এসে থেমে ছিলেন। স্টার লাইন বাসের চালক আ. কাদেরও জানান, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে চান্দিনায় যানজটে আটকে পরে সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত গৌরীপুর এলাকায় যানজটে ছিলেন।
চট্টগ্রাম থেকে বাগেরহাটগামী একটি বাসের যাত্রীরা জানান, রাত আড়াইটার দিকে দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জে আটকা পড়ার পর সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে আমিরাবাদে পৌঁছাতে পেরেছেন।
দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার ওসি প্রেম দাস জানান, আষাঢ়িয়ার চর সেতুর ঢাকা অভিমুখী লেনে বড় গর্তের কারণে সংস্কারকাজ শুরু হয়েছিল। কাজ চলাকালে একটি লেন দিয়ে উভয় দিকের যানবাহন চলাচল করায় যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়।
তবে শনিবার সকাল থেকে দুই লেনেই যানবাহন চলাচল করছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করছে পুলিশ।
ভবেরচর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মোহাম্মদ শামীমও জানান, আষাঢ়িয়ার চর এলাকায় সংস্কারকাজ শুরুর পর থেকেই যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। যাত্রী ও চালকদের দুর্ভোগ কমাতে হাইওয়ে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে।
