স্বামী হত্যার মামলার আসামির পরিবারের করা বাড়িঘর ভাঙচুর ও মালামাল লুটের মামলায় কক্সবাজারের মহেশখালীর ফাতেমা বেগমকে দেড় বছরের শিশুসহ কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একই মামলায় গ্রেপ্তার তার শাশুড়ি ও বেড়াতে আসা মেয়ে জামিনে মুক্তি পেলেও ফাতেমার দুই মেয়ে এখন মাকে ছাড়া রয়েছে।
ফাতেমার দুই মেয়ে রাজমিন আকতার ও মিশকাত জান্নাত যথাক্রমে চতুর্থ ও প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। মাকে কাছে না পেয়ে তারা কান্নাকাটি করছে। বর্তমানে তারা কুতুবজোমের তাজিয়াকাটা সুমাইয়া (রা.) এতিমখানায় রয়েছে। অন্যদিকে দেড় বছরের শিশুটি মায়ের সঙ্গে কারাগারে আছে।
২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের কামিতার পাড়ার কবির বাজারে কথা কাটাকাটির জেরে মোহাম্মদ কাশেমকে রাসেলসহ কয়েকজন কুপিয়ে হত্যা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরদিন কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা বেগম রাসেলসহ ১০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় রাসেল চার নম্বর আসামি।
এর প্রায় এক মাস পর ২৪ মে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও মালামাল লুটের অভিযোগে আদালতে মামলা করেন রাসেলের মা নুর জাহান বেগম। অভিযোগে ফাতেমা বেগম, তার শাশুড়ি, ভাসুর, দেবর ও ননদসহ সাতজনকে আসামি করার আবেদন করা হয়।
আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে মহেশখালী থানাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়। মামলার তদন্ত করেন এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম। তিনি ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেন।
আদালতে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, তদন্ত কর্মকর্তা বাদীর দেওয়া সাতজন সাক্ষীর বাইরে অন্য কারও সাক্ষ্য নেননি। প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ওই সাত সাক্ষীর বক্তব্যে দাড়ি, কমা ও সেমিকোলনসহ প্রায় একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, আলামত জব্দের চেষ্টা, বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের জবানবন্দি নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি আসামিদের নাম-ঠিকানা যাচাই এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে তদন্তের কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে সাংবাদিকদের কাছে এসআই মোজাহেরুল ইসলাম বলেন, আদালতে দেওয়া অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে বাদীর দেওয়া সাক্ষীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই তাদের বাইরে অন্য কারও সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি। ২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, সেটিই তদন্তে দেখা হয়েছে এবং সাক্ষীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
ফাতেমা বেগমের বিরুদ্ধে করা মামলার তিন সাক্ষী নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগমের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তারা জানান, ফাতেমার বিরুদ্ধে করা মামলায় তারা কোনো সাক্ষ্য দেননি। সাক্ষীদের তালিকায় তাদের নাম কীভাবে এসেছে, সেটিও তারা জানেন না।
তাদের দাবি, ২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেনি। মামলায় যে ঘরবাড়ি ভাঙচুরের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো ২৩ এপ্রিল কাশেম হত্যার দিন উত্তেজিত এলাকাবাসী ভেঙে ফেলেছিল। এতে কাশেমের পরিবারের কেউ জড়িত ছিলেন না বলেও দাবি করেন তারা।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান, আয়েশা বেগম ও মমতাজ বেগমও ২৪ মে ঘরবাড়ি ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন।
তাদের ভাষ্য, কাশেম হত্যার পর তার পরিবারকে চাপে ফেলা এবং প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে।
গত ৩১ আগস্ট রাতে মহেশখালী থানা পুলিশের একটি দল ফাতেমা বেগম, তার শাশুড়ি রাশেদা বেগম এবং বেড়াতে আসা মেয়ে নাছিমা আকতারকে গ্রেপ্তার করে। রাশেদা বেগমের ভাষ্য, গ্রেপ্তারের সময়ই তারা প্রথম জানতে পারেন যে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
পরদিন ১ সেপ্টেম্বর তাদের আদালতে হাজির করা হলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত দুজনকে জামিন দেন। তবে দেড় বছরের শিশুসহ ফাতেমা বেগমকে কারাগারে পাঠানো হয়।
রাশেদা বেগম অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে হত্যার পর তাদের বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। মামলার বিষয়টি আগে থেকে জানতেন না বলেও দাবি করেন তিনি।
ফাতেমার বাড়িতে গিয়ে প্রতিবেদক দেখতে পান, মাটির দেয়াল ও টিনের চাল দিয়ে তৈরি তিন কক্ষের একটি ছোট ঘর। সেখানে শাশুড়ির সঙ্গে তিন সন্তানকে নিয়ে থাকতেন ফাতেমা।
স্বামীকে হারানোর পর এবার সন্তানদের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন তিনি। একদিকে দেড় বছরের শিশুটি মায়ের সঙ্গে কারাগারে, অন্যদিকে দুই মেয়ে মাকে ছাড়া এতিমখানায় অবস্থান করছে।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাহমুদুল হক বলেন, ২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং কারও ঘরবাড়িও ভাঙচুর করা হয়নি। তার দাবি, কাশেম হত্যার পর তার পরিবারকে দুর্বল করতে স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে।
ইউপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শেখ কামাল বলেন, কাশেম হত্যার পর উত্তেজিত লোকজন তার পরিবারের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আসামিপক্ষ আদালতে মামলা করে বলে জানান তিনি। ফাতেমা বেগমের জামিনের জন্য বিনা ফিতে আদালতে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন চেয়ারম্যান।
মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা প্রতুল সেন বলেন, থানার প্রতিটি মামলার তদন্ত তদারকি করা তার দায়িত্ব। এই মামলার বিস্তারিত তার মনে নেই জানিয়ে তিনি বিষয়টি জেনে পরে জানানোর কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, সব সাক্ষীর জবানবন্দি একই হলে এবং বিষয়টি আদালতের নজরে এলে আদালত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুসহ ফাতেমার কারাগারে থাকার বিষয়টি তিনি জেনেছেন। মামলা-সংক্রান্ত বিষয় আদালতের এখতিয়ারাধীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানবিক দিক বিবেচনায় ফাতেমার প্রয়োজন অনুযায়ী আইনি সহায়তা দিতে জেলা লিগ্যাল এইডকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতিকেও বিষয়টি দেখভালের অনুরোধ করা হবে।
এ ছাড়া এতিমখানায় থাকা ফাতেমার দুই সন্তানের প্রয়োজনীয় দেখভালের জন্য মহেশখালীর ইউএনওকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
