শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলের জাফনা এলাকার চেম্মানিতে একটি গণকবর থেকে শিশু ও নবজাতকসহ ৫৭২ জনের কঙ্কালাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। এটিকে দেশটিতে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় গণকবর বলে মনে করা হচ্ছে। তবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ও মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশান সম্প্রসারণের কাজ চলার সময় মাটি খুঁড়তে গিয়ে শ্রমিকেরা মানবদেহের অবশিষ্টাংশ দেখতে পান। এরপর তদন্ত শুরু হয় এবং প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ চালানো হয়। আগস্টের মধ্যে খননের তৃতীয় ধাপ শেষ হলে মোট ৫৭২ জনের কঙ্কালাবশেষ উদ্ধার করা হয়।
চেম্মানিতে গণকবর থাকার বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গৃহযুদ্ধের সময় এক তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় দোষী সাব্যস্ত এক সেনাসদস্য আদালতে জানিয়েছিলেন, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ওই এলাকায় ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে কবর দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে সেখানে প্রথম দফার খননে ১০টির বেশি মানব কঙ্কালও পাওয়া যায়। তবে ওই আবিষ্কার বা অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো বিচার হয়নি।
নতুন গণকবরটি এমন একটি এলাকায় পাওয়া গেছে, যা শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। স্থানীয় তামিলদের কেউ কেউ মনে করছেন, এখানে গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া বেসামরিক মানুষের দেহাবশেষ থাকতে পারে।
প্রতিবেদনে জেয়ারুবি জয়পালানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে তাঁর বাবা কান্দাইয়া জয়পালানকে চেম্মানির কাছে একটি সেনা চেকপয়েন্ট থেকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি আর ফিরে আসেননি। নতুন এই আবিষ্কারের মাধ্যমে তাঁর বাবাসহ নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
শ্রীলঙ্কা মানবাধিকার কমিশনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাফনগুলো অবৈধ ছিল এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এগুলোর সম্পৃক্ততার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্ধার হওয়া অনেক দেহাবশেষ কাপড়বিহীন অবস্থায়, ঘনভাবে এবং কিছু ক্ষেত্রে একটির ওপর আরেকটি স্তূপ করে অগভীর গর্তে পাওয়া গেছে।
তবে এখনো ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা কারা ছিলেন বা কীভাবে তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল—এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
শ্রীলঙ্কায় ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধে আনুমানিক এক লাখ মানুষ নিহত এবং প্রায় ২৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন। নিরাপত্তা বাহিনী ও তামিল টাইগার—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন নৃশংসতা ও অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
গত কয়েক দশকে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ২০টির বেশি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেলেও সেগুলোর কোনোটি নিশ্চিতভাবে জোরপূর্বক গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা যায়নি। ২০১৮ সালে মান্নারে পাওয়া একটি গণকবর থেকে ৩৫০টির বেশি কঙ্কাল উদ্ধার হলেও সেই তদন্তও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
চেম্মানির উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ বর্তমানে জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগের কাছে আদালতের হেফাজতে রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন তৈরি করছেন। দেহাবশেষের বয়স ও মৃত্যুর কারণ জানতে আরও পরীক্ষা চালানো হবে এবং প্রয়োজনে কিছু নমুনা বিদেশেও পাঠানো হতে পারে।
সরকার জানিয়েছে, তারা তদন্তে সহযোগিতা করছে এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করবে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে চেম্মানিতে কবর দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করতে হবে।
৫৭২ জনের পরিচয়, মৃত্যুর কারণ এবং তাঁদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ ব্যক্তির সংখ্যা কত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তকরণ, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছে।
