শেরপুরের গারো পাহাড়ে তিন দশক ধরে মানুষ ও বন্যহাতির সংঘাত চলে আসছে। ১৯৯৬ সালের দিকে শুরু হওয়া এ সংকট কমাতে বিভিন্ন সময়ে সভা-সেমিনার, সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও নানা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে সোলার ফেন্সিং, গঠন করা হয়েছে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) এবং হাতির খাবারের জন্য বিভিন্ন গাছও লাগানো হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও সংঘাত পুরোপুরি কমেনি। বরং হাতির আক্রমণ, ফসলের ক্ষতি, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে গারো পাহাড়ে মানুষ-হাতির সংঘাতে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে মারা গেছে ৩১টি হাতি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব হাতির বেশির ভাগই মানুষের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদে মারা গেছে। ফলে দীর্ঘদিনের এ সংঘাতে মানুষ ও হাতি—উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গারো পাহাড়ের প্রায় ৪০ কিলোমিটার সীমান্তবর্তী এলাকায় সংকট সবচেয়ে তীব্র। সন্ধ্যার পর খাবারের সন্ধানে গভীর বন থেকে হাতির পাল লোকালয়ে চলে আসে। তারা ধান, শাকসবজি, কলাগাছ, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফসল ও ফলদ গাছ নষ্ট করে। গোলার ধান-চাল খাওয়ার পাশাপাশি পায়ে মাড়িয়ে নষ্ট করে খাদ্যশস্য। অনেক সময় কাঁচা ঘরবাড়িও ভেঙে ফেলে। এতে সন্ধ্যার পর সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
হাতির ভয়ে অনেক কৃষক জমিতে ফসল চাষ করতেও আগ্রহ হারাচ্ছেন। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে চাষ করলেও ফসল ঘরে তোলার আগেই হাতির পাল তা নষ্ট করে দেয়। সামনে ধানের মৌসুমে সংঘাত আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সংঘাত কমাতে ২০১৪ সালে তাওয়াকোচা ও বালিজুরি ফরেস্ট রেঞ্জ এলাকায় হাতির খাদ্যের জন্য বাঁশ, কলাগাছসহ বিভিন্ন দেশীয় বৃক্ষ রোপণ করা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন পর এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা প্রায় নেই।
প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় সোলার ফেন্সিং স্থাপন করা হলেও সেটিও দীর্ঘদিন ধরে অকেজো পড়ে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পের এমন পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়া হাতির আক্রমণ থেকে মানুষকে সতর্ক করতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় ১০টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি দলে রয়েছেন ১০ জন করে সদস্য। তবে প্রয়োজনের সময় তাঁদের পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকলে অনেক সময় গ্রামবাসীকেই ঝুঁকি নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।
হাতি তাড়ানোর সরঞ্জামেরও সংকট রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে জেলা পরিষদ ও জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে টর্চলাইট দেওয়া হলেও দুর্গম ও দরিদ্র হাতিকবলিত এলাকার অনেক মানুষ এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন বিভাগের জমির পরিমাণ প্রায় ২১ হাজার একর। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার একর জমি বেদখলে রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, দখল হওয়া জমির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার একর। এসব এলাকায় শত শত ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে এবং চলছে চাষাবাদ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাতির জন্য স্থায়ী খাদ্যভান্ডার ও নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি করতে হলে প্রথমে বনভূমি দখলমুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বনাঞ্চলে বসবাসকারীদের পুনর্বাসন এবং হাতির চলাচলের করিডর ও আবাসস্থল নিরাপদ করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
দীর্ঘ ৩০ বছর পর গারো পাহাড়ে বন্যহাতির জন্য অভয়ারণ্য ও স্থায়ী খাদ্যভান্ডার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে শেরপুর জেলা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তরের আয়োজনে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী সেমিনারে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেল। এতে বন বিভাগের কর্মকর্তা, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ, পুলিশ, বিজিবি, ইআরটি সদস্য, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন।
সেমিনারে হাতির আবাসস্থল সংরক্ষণ, মানুষের নিরাপত্তা, ফসল ও বসতবাড়ি রক্ষা এবং মানুষ-হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে অভয়ারণ্য ও স্থায়ী খাদ্যভান্ডার তৈরির বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, তিন দশক ধরে বিভিন্ন প্রকল্প, সভা-সেমিনার ও উদ্যোগ নেওয়ার পরও যদি সংঘাত বন্ধ না হয়, তাহলে এসব উদ্যোগের বাস্তব সুফল কোথায়?
তাঁদের মতে, এবার পরিকল্পনা শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে। হাতির চলাচলের করিডর ও আবাসস্থল চিহ্নিত করে নিরাপদ অভয়ারণ্য ও পর্যাপ্ত খাদ্যভান্ডার গড়ে তোলার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কার্যকর ক্ষতিপূরণ এবং সীমান্ত এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিন দশকের নানা উদ্যোগের পর এবার অভয়ারণ্য তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই দেখার বিষয়।
