বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারির ব্যবহার শুরু হয়েছে। রাজধানীর ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে গত ৩১ আগস্ট প্রথম কয়েকটি রোবোটিক অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ১২ জন রোগীর রোবোটিক সার্জারি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা। তাঁদের প্রত্যেকেই সুস্থ আছেন বলে জানানো হয়েছে।
রোবোটিক সার্জারির মাধ্যমে ১১ বছর বয়সী এক শিশুর প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। শিশুটি দীর্ঘদিন মায়াস্থেনিয়া গ্র্যাভিসে ভুগছিল এবং প্রচলিত পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে বুকের হাড় কাটার প্রয়োজন হতো। এ কারণে শিশুটি ও তার পরিবার অস্ত্রোপচারে রাজি হচ্ছিল না।
পরে ২ সেপ্টেম্বর রোবটের সহায়তায় অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ শিশুটির অস্ত্রোপচার করেন। বুক কাটার পরিবর্তে ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন করা হয়। অস্ত্রোপচারের পরদিনই শিশুটি চিকিৎসকের সঙ্গে ফুটবল খেলেছে।
রোবোটিক সার্জারি নিয়ে অনেকের ধারণা, রোবট নিজে স্বাধীনভাবে অস্ত্রোপচার করে। তবে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এটি মূলত চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণে রোবটের সহায়তায় করা অস্ত্রোপচার।
অধ্যাপক রফিকুস সালেহীনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচলিত অস্ত্রোপচারে সার্জন নিজ হাতে যেসব কাজ করেন, রোবোটিক সার্জারিতে রোবোটিক বাহু সেই কাজে সহায়তা করে। সার্জন থ্রিডি মনিটরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ত্রিমাত্রিক দৃশ্য দেখে রোবোটিক বাহুগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন।
রোবোটিক অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি নমনীয় এবং ৩৬০ ডিগ্রি নড়াচড়ার সুবিধা থাকায় শরীরের জটিল ও সূক্ষ্ম অংশে কাজ করা সহজ হয় বলে চিকিৎসকেরা জানান।
ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে ব্যবহৃত রোবটটির নাম ‘মেডবট তুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট’। এটি চীনে তৈরি। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিতে বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা চীনে দুই দফা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণের সময় কৃত্রিম অঙ্গ ও প্রাণীর অঙ্গে ধাপে ধাপে অস্ত্রোপচার করেন তাঁরা। পরে চীনের চিকিৎসকদের সঙ্গে মানুষের অস্ত্রোপচারেও অংশ নেন বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা।
মেডবট রোবটটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে আনা হয়। তবে অস্ত্রোপচারের জন্য সরকারি অনুমতি না থাকায় তখন এটি ব্যবহার করা যায়নি। অনুমতি পাওয়ার পর গত মাসে প্রথম রোবোটিক অস্ত্রোপচার করা হয়।
চিকিৎসকেরা জানান, রোবোটিক সার্জারিতে ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করা হয়। ফলে রক্তপাত, ব্যথা ও শারীরিক ধকল তুলনামূলক কম হতে পারে। অস্ত্রোপচারের পর রোগীও কম সময়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
রোবোটিক সার্জারিতে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও গঠন বড় করে দেখার সুবিধা রয়েছে। প্রায় ১৫ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত বড় করে দেখা সম্ভব বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক সামছাদ জাহান। একই সঙ্গে সার্জনের হাতের স্বাভাবিক কাঁপুনি বা ট্রেমর ফিল্টার করা হয়, ফলে আশপাশের টিস্যু কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ থাকে।
দেশে রোবোটিক সার্জারির খরচ ল্যাপারোস্কপিক সার্জারির তুলনায় দুই থেকে আড়াই গুণ বেশি। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশের তুলনায় এই খরচ কম।
চিকিৎসকেরা আশা করছেন, দেশে এই সুবিধা চালু হওয়ায় বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিদেশ থেকেও রোগীরা কম খরচে অস্ত্রোপচারের জন্য বাংলাদেশে আসতে পারেন বলে তাঁরা মনে করছেন।
চিকিৎসকদের মতে, ভবিষ্যতে কোলন, পাকস্থলী, অন্ত্র, কিডনি, প্রোস্টেট ও জরায়ুর অস্ত্রোপচারে রোবোটিক সার্জারির ব্যবহার বাড়তে পারে। পাশাপাশি দেশের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের সুযোগও তৈরি হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
