মাদক মামলার চাপ কমানো এবং বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কক্সবাজারে তিনটি ‘মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল’ চালু করা হয়েছে। এসব ট্রাইব্যুনালে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য অপরাধের মামলার বিচার হবে।
মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক প্রবেশের কারণে কক্সবাজার দেশের অন্যতম মাদকপ্রবণ জেলা হিসেবে পরিচিত। স্থল ও জলপথে নিয়মিত মাদকের চালান আটক হওয়ার পাশাপাশি মাদকসংক্রান্ত মামলাও বাড়ছে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন আদালতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা প্রায় ৬ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা-৪ থেকে জারি করা গেজেটের মাধ্যমে কক্সবাজারের তিনটিসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মোট ২২টি মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। একই গেজেটে এসব ট্রাইব্যুনালের বিচারিক অধিক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে।
কক্সবাজারের ট্রাইব্যুনাল-১-এর আওতায় থাকবে টেকনাফ, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপজেলা। ট্রাইব্যুনাল-২-এর অধিক্ষেত্রে রয়েছে সদর, উখিয়া ও ঈদগাঁও। আর ট্রাইব্যুনাল-৩-এর আওতায় থাকবে রামু, চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা।
তবে নতুন এজলাস ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় আপাতত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নিয়ন্ত্রণাধীন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-৩, ৪ ও ৫-এর শাখায় ট্রাইব্যুনালগুলোর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
নতুন ট্রাইব্যুনাল চালুর দিন রোববার কক্সবাজারে মাদকের দুটি বড় চালান জব্দ করা হয়। সন্ধ্যায় কক্সবাজার সরকারি কলেজের নারী হোস্টেল দোলনচাঁপায় এক শিক্ষার্থীর খাটের নিচ থেকে ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে সদর থানা পুলিশ। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কলেজ কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় অভিযান চালিয়ে শরিফা আক্তার নামে ওই শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়।
পুলিশের দাবি, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ওই শিক্ষার্থীর এক নিকটাত্মীয় ইয়াবার চালানটি তাঁর কাছে পাঠিয়েছিলেন। আটক শিক্ষার্থী স্নাতক (সম্মান) গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।
এর আগে একই দিন ভোরে রামুর খুনিয়াপালংয়ের প্যাঁচারদ্বীপ রেজুখাল চেকপোস্ট এলাকায় একটি প্রাইভেটকারে তল্লাশি চালিয়ে ৮৯ হাজার ৪০০ ইয়াবা জব্দ করে বিজিবি। এ সময় একজন পাচারকারীকে আটক করা হয়।
দুটি অভিযানে মোট ১ লাখ ৯ হাজার ৪০০ ইয়াবা জব্দ হওয়ায় কক্সবাজারে মাদক পাচারের ব্যাপকতার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় মামলা হওয়ায় বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও বাড়ছে।
কক্সবাজার বিচার বিভাগের জেলা নাজির এম. বেদারুল আলম জানান, গেজেট প্রকাশের ৬০ দিনের মধ্যে নিয়মিত আদালতে বিচারাধীন ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে দায়ের করা পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য অপরাধের মামলাগুলো নতুন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করতে বলা হয়েছে।
তিনি জানান, মামলাগুলো যে পর্যায়ে রয়েছে, সেই পর্যায় থেকেই নতুন ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শুরু হবে। ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৪৪(ক)-এর ২ ধারা অনুযায়ী অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচারকরা এসব ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী বাপ্পী শর্মা বলেন, ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মাদক মামলার বিচারের জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান থাকলেও এতদিন তা বাস্তবায়িত হয়নি। নতুন ট্রাইব্যুনাল চালুর ফলে এসব মামলার বিচার দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মন্নান বলেন, মাদক চোরাচালানপ্রবণ এলাকায় পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের ফলে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে। তাঁর মতে, দ্রুত বিচার ও রায় হলে এর প্রভাব মাদক চোরাচালানের ওপর পড়তে পারে।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি, সাবেক পিপি ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরও পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনকে মাদকপাচার রোধে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর আশা, ট্রাইব্যুনালগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে মাদকসংক্রান্ত মামলার বিচার দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
