বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে কক্সবাজারে চলছে তিন দিনব্যাপী পর্যটন মেলা। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে মেলায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ফায়ার শো, ব্যান্ড শো, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও পোশাকের স্টলসহ নানা আয়োজন। মেলাকে ঘিরে লাবণী পয়েন্টে স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদেরও ভিড় বেড়েছে। তবে উৎসবের এই আয়োজনের মধ্যেও পর্যটনকেন্দ্রটির অব্যবস্থাপনা ও নানা সমস্যার বিষয়টি সামনে এসেছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) থেকে লাবণী পয়েন্টে তিন দিনব্যাপী এ মেলা শুরু হয়। ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত মেলার উদ্বোধন করেন কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আরা বেগম স্বপ্না। সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান।
সমাপনী দিনে সকালে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। পরে আলোচনা সভা, ঘুড়ি উৎসব, সি-সেফ লাইফগার্ডের জরুরি সেবা ও ফার্স্ট এইড কার্যক্রমের প্রদর্শনী এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। রাতে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক অনুষ্ঠান ‘অঁলা’র মধ্য দিয়ে মেলার সমাপ্তি হওয়ার কথা রয়েছে।
মেলায় অর্ধশতাধিক স্টল রয়েছে। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে কক্সবাজারের পর্যটন, সংস্কৃতি ও স্থানীয় ঐতিহ্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, সবুজ প্রকৃতি, দ্বীপ, নদী ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের কারণে কক্সবাজারে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসেন। তবে পর্যটকদের অভিযোগ, পর্যটন অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা এখনো সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি।
সৈকতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা, অপর্যাপ্ত গণশৌচাগার, যানজট, ফুটপাত দখল, অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ছুটির দিন ও পর্যটন মৌসুমে শহরের প্রধান সড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজটের কারণে ভোগান্তিতে পড়েন পর্যটকরা।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক সুরাইয়া আক্তার নাহিদা বলেন, কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর অনেক পর্যটক আসেন। তবে সৈকতকেন্দ্রিক বিনোদনের বাইরে নতুন আকর্ষণ ও বিনোদনের ব্যবস্থা এবং পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। সৈকতে লাইফগার্ড কর্মীরা দায়িত্ব পালন করলেও সাগরের উত্তাল পরিস্থিতিতে অনেক পর্যটক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে পানিতে নামেন। এতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পানিতে ডুবে অন্তত ৭৬ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে লাইফগার্ড ও বিচকর্মীদের তৎপরতায় প্রায় ১ হাজার ৪৩ জন পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
এ ছাড়া সৈকতে পর্যটকদের সঙ্গে অসদাচরণ, ছিনতাই, প্রতারণা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটকদের নিরাপত্তায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
কলাতলী, লাবণী, সুগন্ধা ও প্রধান সড়ককেন্দ্রিক এলাকায় পর্যটন মৌসুমে যানবাহনের চাপ বেড়ে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। এতে কয়েক কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতেও পর্যটকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। স্থানীয়দের মতে, মেলার আয়োজনের পাশাপাশি সড়ক, পার্কিং ও গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা জরুরি।
হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, বিচবাইক, ফটোগ্রাফি ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক সেবায় অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েকজন ব্যবসায়ী বা সেবাদাতার অনিয়ম পুরো কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসার ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলছে। তাই নির্ধারিত মূল্যতালিকা কার্যকর ও নিয়মিত তদারকির দাবি রয়েছে।
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন সময়ে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হলেও এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
শুধু সমুদ্রসৈকত বা কয়েকটি বিনোদনকেন্দ্র থাকলেই পর্যটন শিল্প টেকসই হয় না। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ আবাসন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পার্কিং, মানসম্মত খাবার, জরুরি চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও তথ্যসেবা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
বিশ্ব পর্যটন দিবসের আয়োজনের অংশ হিসেবে সৈকত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক এমন কর্মসূচির পাশাপাশি প্রতিদিনের জন্য কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পর্যটকদের সচেতন করার উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
