T TIME NEWS (6)
মুদ্রার পতন ও ভিসা কঠোরতায় বিদেশে উচ্চশিক্ষা

মুদ্রার পতন ও ভিসা কঠোরতায় বিদেশে উচ্চশিক্ষা

বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে ভারতীয় রুপির অব্যাহত পতন, কঠোর ভিসা নীতি এবং চাকরির অনিশ্চয়তা—এই তিন চাপ একসঙ্গে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে চলতি বছর রোমে মাস্টার্সে ভর্তি হতে যাচ্ছেন ভারতের ঝাড়খণ্ডের ২৯ বছর বয়সী কনটেন্ট ক্রিয়েটর প্রগতি প্রিয়া। সেপ্টেম্বর থেকে তার ইউরোপিয়ান গ্লোবাল ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করার কথা রয়েছে। ইউরোপে পেশাগত সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

তবে স্বপ্নের এই যাত্রা নিয়ে তিনি যেমন উচ্ছ্বসিত, তেমনি অর্থনৈতিক চাপ নিয়েও গভীর উদ্বেগে আছেন। রুপির মূল্য ইউরোসহ বিভিন্ন মুদ্রার বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় তার শিক্ষা ঋণের পরিমাণও বেড়ে গেছে।

প্রগতি প্রিয়া বলেন, “এটি আমাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না। আমি এমন ঋণের বোঝা নিতে চাই না, যা কখনও শোধ করা সম্ভব হবে না।”

ভারতের মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের অবস্থাও একই ধরনের অনিশ্চয়তায় ঘেরা। প্রতিবছর লাখ লাখ ভারতীয় শিক্ষার্থী ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার জন্য বিদেশে যান।

২০২৫ সালে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি ভারতীয় শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যুক্ত ছিলেন। কয়েক বছর আগেই ভারত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর উৎস হিসেবে চীনকে ছাড়িয়ে শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে।

তবে রুপির দুর্বলতা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সীমিত চাকরির সুযোগ এবং কঠোর ভিসা নীতির কারণে বিদেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছেন অনেকেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খরচ বাড়ার কারণে শিক্ষার্থী নাম নিবন্ধনের হারও কমছে।

শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এডওয়াইজ ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা সুশীল সুখওয়ানি জানান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শিক্ষার্থীর ভর্তি গত দুই বছরে প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে এবং আগামী বছর আরও পতন হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, রুপির মান ডলারের বিপরীতে গত এক বছরে ১০ শতাংশের বেশি এবং ২০১৯ সালের তুলনায় ৩৫ থেকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, যা বিদেশে শিক্ষাকে অনেক বেশি ব্যয়বহুল করে তুলেছে।

অন্যদিকে, বিদেশে পড়তে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পেয়ে গিগ ইকোনমিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন নর্থ আমেরিকা অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস-এর প্রতিষ্ঠাতা সুধাংশু কৌশিক। তার মতে, এতে মধ্যবিত্ত পরিবারের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

তবে সব চাপের মধ্যেও বিদেশে পড়াশোনার চাহিদা এখনো শক্তিশালী রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ তুলনামূলক কম খরচ, সহজ কর্মসংস্থান সুযোগ এবং স্থিতিশীল নীতির কারণে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের নতুন গন্তব্য হয়ে উঠছে।

প্রগতি প্রিয়া জানান, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইতালিতে তার কোর্সের খরচ প্রায় অর্ধেক। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করলে সময় ও খরচ—দুটোই বেশি হতো বলে তিনি সে পথ বেছে নেননি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ ভারত এখনও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী উৎস দেশ।

তারা আরও সতর্ক করে বলছেন, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, কঠোর অভিবাসন নীতি এবং চাকরির বাজারের পরিবর্তন একসঙ্গে মিলে বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি করছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *