একসময় দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতো বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক। বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও জনগণের পারস্পরিক যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই গত এক দশকে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সূচক বলছে, সেই সম্পর্ক এখন একটি জটিল ও সংবেদনশীল পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথে যে পরিবর্তনের আভাস মিলেছিল, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে তার প্রতিফলন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যে ধীরগতি, ভিসা সংকট, সীমান্ত ইস্যু, তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে অগ্রগতির অভাব এবং জ্বালানি খাতে বকেয়া—সব মিলিয়ে সম্পর্কের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্যে গতি হারাচ্ছে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ আমদানি উৎস এবং বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার।
তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি আগের মতো নেই। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দুই দেশের বাণিজ্যে মন্থরতা দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকলেও আগের মতো দ্রুত সম্প্রসারণের ধারা বর্তমানে থমকে আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির প্রত্যাশা অনুযায়ী অগ্রগতি না হওয়ায় বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভিসা সংকটের প্রভাব জনসংযোগে
দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা গেছে ভিসা কার্যক্রমে।
একসময় প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও পর্যটনের উদ্দেশ্যে ভারতে যাতায়াত করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিসা ইস্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এর ফলে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং পর্যটকদের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে বিমান ও স্থলবন্দরভিত্তিক যাত্রী চলাচলও কমে গেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপরও পড়ে।
সীমান্তে পুরোনো সমস্যা এখনো রয়ে গেছে
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা।
সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। যদিও সীমান্তে যৌথ টহল ও বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে, তবুও মাঝেমধ্যে উত্তেজনা দেখা দিচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সীমান্তে প্রাণহানি পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ রয়ে গেছে। অন্যদিকে ভারত সীমান্ত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলছে।
তিস্তা চুক্তি এখনো অধরা
দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে আলোচিত অমীমাংসিত বিষয়গুলোর একটি হলো তিস্তা নদীর পানি বণ্টন।
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনায় থাকলেও এখনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার জন্য তিস্তার পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা চুক্তিতে অগ্রগতি হলে দুই দেশের মধ্যে আস্থার পরিবেশ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
জ্বালানি সহযোগিতায় নতুন চাপ
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুৎ বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে বিলম্ব এবং কিছু প্রকল্পের আর্থিক বিষয় নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও পাওনা নিয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে আর্থিক ও কারিগরি সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ
দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশ একদিকে ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা সম্প্রসারণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিক হলেও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
সামনে কী?
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কের সংকটের চেয়ে বরং একটি পুনর্গঠনের পর্যায়কে নির্দেশ করে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক স্বার্থ, নিরাপত্তা সহযোগিতা, জ্বালানি সংযোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রয়েছে, যা সম্পর্ককে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ দেয় না।
তবে আস্থার ঘাটতি, সীমান্ত ইস্যু, ভিসা সংকট এবং অমীমাংসিত পানি বণ্টন প্রশ্নের সমাধান না হলে সম্পর্কের বর্তমান শীতলতা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিচ্ছে—বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আগামী মাসগুলোতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কূটনৈতিক সংলাপ এবং বাস্তবমুখী সহযোগিতার ওপরই নির্ভর করবে এই সম্পর্ক নতুন গতি পাবে, নাকি বর্তমান দূরত্ব আরও বাড়বে।
