বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধুত্ব আর নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন ১৫ জন কৃষিবিদ বন্ধু। প্রায় দুই দশক আগে দেখা সেই স্বপ্নের ভিত্তিতে তাঁরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল ও নওগাঁর নিয়ামতপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন ৪৫ বিঘাজুড়ে তিনটি মিশ্র ফলের বাগান। সেখানে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি প্রয়োগ করে উৎপাদন করা হচ্ছে নিরাপদ আমসহ বিভিন্ন ফল।
‘গ্রোয়ার্স গ্রুপ’ নামে পরিচালিত এই উদ্যোগের উদ্যোক্তারা জানান, তাঁদের মূল লক্ষ্য শুধু ব্যবসায়িক লাভ নয়; বরং পরিবার, স্বজন ও সাধারণ মানুষের জন্য বিষমুক্ত ফল সরবরাহ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নিরাপদ ও টেকসই কৃষি পদ্ধতির প্রসার ঘটানোরও চেষ্টা করছেন তাঁরা।
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার চৌড়াপাড়া এলাকায় গ্রুপটির একটি বাগানে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন জাতের আমে ভরে আছে গাছগুলো। পাশাপাশি রয়েছে আনার, ড্রাগন, মাল্টা, কমলা, লংগান, বিদেশি জাম্বুরা ও কলার চাষ। উদ্যোক্তাদের দাবি, গত দুই বছর ধরে এসব বাগান থেকে আশাব্যঞ্জক ফলন পাওয়া যাচ্ছে।
গ্রোয়ার্স গ্রুপের অন্যতম উদ্যোক্তা মফিজুর রহমান জানান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। পরে কর্মজীবনে প্রবেশের পরও সেই ভাবনা অটুট থাকে। বিশেষ করে করোনা-পরবর্তী সময়ে তাঁরা পরিবেশবান্ধব কৃষি উদ্যোগ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, তাঁদের উৎপাদন ব্যবস্থায় জৈব ও অজৈব উপাদানের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা হয়। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং নিরাপদ ফল উৎপাদনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিতভাবে বাগান পরিচালনা করা হচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সাল থেকে তাঁরা নিয়মিত মাসিক সঞ্চয় শুরু করেন। প্রথমদিকে প্রত্যেকে মাসে দুই হাজার টাকা এবং পরবর্তী সময়ে তিন হাজার টাকা করে জমা দেন। দীর্ঘ সময়ের সঞ্চয়ে প্রত্যেকের প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা জমা হয়। পরে অতিরিক্ত বিনিয়োগ যোগ করে প্রায় এক কোটি টাকার মূলধন নিয়ে ১২ বছরের জন্য জমি ইজারা নিয়ে ফলবাগান স্থাপন করেন তাঁরা।
বাগান ব্যবস্থাপনায় জৈব সারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতি গাছে প্রয়োজন অনুযায়ী পচা গোবর সার প্রয়োগের পাশাপাশি সীমিত মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়নে উপকারী ছত্রাক ট্রাইকোডার্মাও ব্যবহার করা হচ্ছে, যা রোগ দমন ও পুষ্টি উপাদান গ্রহণে সহায়তা করে।
পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণেও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ইয়েলো স্টিকি ট্র্যাপ এবং ফলের সুরক্ষার জন্য বিশেষ ব্যাগিং পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় তাঁদের বাগানে বালাই দমনের খরচ কয়েক গুণ কম।
বাগানের মাটির গুণাগুণ নিয়মিত পরীক্ষার জন্য শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারের সহায়তা নেওয়া হয়। পরীক্ষার ফল অনুযায়ী মাটির অম্লতা নিয়ন্ত্রণ এবং সার ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করা হয়।
গ্রুপটির সদস্য ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইছাক বলেন, টেকসই কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের যে ধারণা শিক্ষার্থীদের শেখানো হয়, সেটির বাস্তব প্রয়োগ ঘটানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা। তাঁর মতে, সুস্থ মাটিই নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তি।
এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। অনেক চাষি ইতোমধ্যে জৈব সার ও মাটি শোধনের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। স্থানীয় কৃষিশ্রমিক ও কৃষকেরা জানান, শুরুতে অনেকেই এই পদ্ধতির সফলতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও বর্তমানে ফলন ও খরচের হিসাব দেখে তাঁদের ধারণা বদলেছে।
নিয়ামতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বাগানটি পরিদর্শন করে তিনি উত্তম কৃষিচর্চার প্রয়োগ দেখতে পেয়েছেন। তাঁর মতে, এটি এলাকার কৃষকদের জন্য একটি ইতিবাচক ও অনুসরণযোগ্য উদ্যোগ।
