পুষ্টিগুণ, উৎপাদন ও রপ্তানি সম্ভাবনায় এগিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় ফল, তবু বাজার ও প্রক্রিয়াজাতকরণে পিছিয়ে
বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির অন্যতম ভরসা হলেও আধুনিক বাজারব্যবস্থা ও নগরজীবনে এটি এখনো কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁঠাল ও কাঁঠালজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বিদেশি দেশগুলোর আগ্রহ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক পরিকল্পনা, প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশ এবং রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে কাঁঠাল বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে।
কৃষি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক অর্থবছরে দেশে ১৮ লাখ টনের বেশি কাঁঠাল উৎপাদিত হয়েছে। উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও রপ্তানির ক্ষেত্রে সেই সাফল্য প্রতিফলিত হয়নি।
দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য এলাকাগুলো এ ফলের প্রধান উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
পুষ্টিবিদদের মতে, কাঁঠাল শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস। এতে রয়েছে প্রোটিন, খাদ্য আঁশ, ভিটামিন সি, ভিটামিন বি-৬, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান।
বিশেষ করে কাঁঠালের বিচি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প পুষ্টির উৎস হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে এবং পাকা কাঁঠাল ফল হিসেবে সমান জনপ্রিয়। পাশাপাশি এর বিচি, খোসা ও অন্যান্য অংশও বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা যায়, ফলে অপচয়ের সুযোগ তুলনামূলক কম।
দেশের অনেক নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবার গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে কাঁঠালের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে এটি খাদ্য ও পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির সময় কাঁঠাল অনেক পরিবারের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী পুষ্টির উৎস হিসেবে কাজ করে। এ কারণে একে দীর্ঘদিন ধরে ‘গরিবের ফল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
সম্প্রতি কৃষি খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশ্বের কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল ও কাঁঠালভিত্তিক খাদ্যপণ্য আমদানির বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশেষ করে চীনসহ কয়েকটি বড় বাজারে কাঁঠালের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
আন্তর্জাতিকভাবে বর্তমানে কাঁঠালকে উদ্ভিজ্জ মাংসের বিকল্প বা ‘ভেজিটেবল মিট’ হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে নিরামিষভোজী ও স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের মধ্যে এর চাহিদা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন বেশি হলেও কাঁঠালের রপ্তানি এখনো সীমিত। এর প্রধান কারণ পর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাব, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থার ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিপণন কৌশলের অভাব।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাঁঠাল থেকে চিপস, ক্যানজাত খাদ্য, হিমায়িত কোয়া, আচার, জ্যাম, জেলি ও উদ্ভিজ্জ মাংসজাত পণ্য তৈরি হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এসব শিল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, কাঁঠালভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকের আয় বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং রপ্তানি আয়ও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে শত শত মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও ‘গরিবের ফল’ হিসেবে পরিচিত কাঁঠাল এখন বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠছে। উৎপাদনে শক্তিশালী অবস্থান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। তবে সঠিক নীতি, বিনিয়োগ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটলে কাঁঠাল ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী কৃষিপণ্যে পরিণত হতে পারে।
