টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা চরমে, স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ
কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া এবং পার্শ্ববর্তী পেকুয়ায় টানা এক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুই উপজেলার অসংখ্য গ্রাম এখনও পানির নিচে থাকায় হাজারো পরিবার খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও জরুরি সহায়তা না পাওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিতে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
রোববার সকাল থেকে নতুন করে ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে নিম্নাঞ্চলের অধিকাংশ বসতঘর, সড়ক ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় মানুষের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠেছে নৌকা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুতুবদিয়ার লেমশীখালী, বড়ঘোপ, উত্তর ও দক্ষিণ ধূরুং, আলী আকবর ডেইল এবং কৈয়ারবিল ইউনিয়নের বহু গ্রাম এখনও জলাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে বড়ঘোপ ইউনিয়নের আজম কলোনিতে কোমরসমান পানি জমে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে পেকুয়া উপজেলার টইটং, বারবাকিয়া, শিলখালী, পেকুয়া সদর, উজানটিয়া, রাজাখালী ও মগনামা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানিবন্দি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, দীর্ঘদিন পানিবন্দি থাকার কারণে খাদ্যসংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক পরিবার রান্না করতে না পেরে শুকনো খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় সহায়তা খুবই সীমিত বলে দাবি তাদের।
উজানটিয়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, পানি কমার কোনো লক্ষণ না থাকায় মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি কষ্টে দিন পার করছে।
স্থানীয়দের একটি বড় অংশের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যক্তি মাছ ধরার সুবিধার জন্য বিভিন্ন স্লুইসগেট ও কালভার্টে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
বড়ঘোপ ইউনিয়নের বাসিন্দা ফরিদ আহমেদ বলেন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঠিক তদারকি না থাকায় প্রতিবছর একই ধরনের দুর্ভোগ দেখা দেয়। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
কৃষক ও মৎস্যচাষিদের ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। অনেকের ঘরবাড়ি, গবাদিপশু ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে জীবিকা হারিয়ে মানবিক সংকটে পড়েছেন তারা।
স্থানীয় এক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক জানান, হঠাৎ পানি বৃদ্ধির কারণে ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। মাছের ঘের ভেসে যাওয়ায় তার আয়ের প্রধান উৎসও বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে পরিবার নিয়ে অন্যের আশ্রয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।
কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বলেন, স্লুইসগেট ও কালভার্টগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পানিবন্দি মানুষের জন্য শুকনো খাবার ও ত্রাণ সহায়তা বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি ইউনিয়নের জন্য জিআর চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সহায়তা চাওয়া হবে। ত্রাণ বিতরণও চলমান রয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে কৃষি, মৎস্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত পানি নিষ্কাশন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন না করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
কুতুবদিয়া ও পেকুয়ার চলমান জলাবদ্ধতা শুধু একটি সাময়িক দুর্যোগ নয়, বরং অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও পানি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা, দ্রুত পানি নিষ্কাশন এবং দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
